
সময় যেন এক অবিরাম মহাকাব্য। বাবা, গত বছর যখন তোমার চতুর্থ জন্মদিনে জাদুকরের সেই রশির ওপর হাঁটার গল্পটা লিখেছিলাম, তখন চলছিলো তোমার জীবনের নতুন এক সমীকরণের প্রস্তুতি। আজ তুমি পাঁচ বছরে পা দিলে। আর এই পঞ্চম বসন্তটি তোমার জন্য শুধু একটি সংখ্যা নয়, বরং এক নতুন পরিচয়ের সূচনা। আজ তুমি একজন বড় ভাই। তোমার পাশে এখন একজন ছোট বোন আছে, যার দিকে তাকিয়ে তুমি হয়তো এখনও পুরোটা বুঝে ওঠোনি – কিন্তু যার অস্তিত্ব তোমাকে নীরবে আরও দায়িত্বশীল করে তুলছে। তুমি এখন একজন ‘বিলিভ’ করা শিশুর চেয়েও বেশি কিছু, তুমি এখন তোমার ছোট বোনের আস্থার আশ্রয়, এক দায়িত্বশীল ‘বড় ভাই’।
গত বছরের সেই জাদুকরের গাড়ির গল্প দিয়ে তোমাকে বুঝিয়ে ছিলাম ‘ফেইথ’ বা আস্থার কথা। বলেছিলাম জাদুকরের সেই ঠেলাগাড়িতে নির্ভয়ে বসে পড়াটাই হলো আসল পরীক্ষা। এবার সেই গল্পের একটি নতুন অধ্যায় যোগ হয়েছে। তুমি এখন আর সেই গাড়িতে একা বসার যাত্রী নয়; পাশে এখন গুটিগুটি পায়ে যুক্ত হয়েছে তোমার ছোট বোন – নিশকা। আগে তুমি কেবল নিজের সুরক্ষার জন্য আমার হাত ধরতে (যেটি ছিল ফেইথ), কিন্তু এখন থেকে তুমি ছোট বোনের হাত ধরে সিঁড়ি দিয়ে নামতে সাহায্য করবে – আর এটাই হলো দায়িত্ববোধ। ফেইথ আমাদের শক্তি দেয় চলার জন্য, আর দায়িত্ববোধ আমাদের শেখায় অন্যের পথকে মসৃণ করতে।
দায়িত্ববোধের জীবনদর্শন নিয়ে ভারি কিছু লিখতে চাইনা। চলো, সমুদ্র তীরের বাতিঘরের একটি গল্প বলি তোমাকে। এক গভীর সমুদ্রের তীরে একটি পুরনো বাতিঘর ছিল। বাতিঘরের রক্ষী যখন বৃদ্ধ হয়ে গেলেন, তিনি তার ছোট ছেলেকে বললেন, “বাবা, সমুদ্র উত্তাল হোক বা শান্ত, এই আলোটা যেন কখনো না নেভে। কারণ এই আলোটা কেবল আমাদের ঘরের নয়, এটি সাগরে ভাসা হাজারো নাবিকের পথ দেখার একমাত্র ভরসা।” ছেলেটি জিজ্ঞেস করল, “বাবা, আমি একা কি এত বড় দায়িত্ব পালন করতে পারব?” বাবা হাসলেন এবং বললেন, “দায়িত্ব মানে পাহাড় বয়ে বেড়ানো নয়, বরং নিজের জায়গায় ঠিকমতো দাঁড়িয়ে থাকা। তুমি যখন জানবে তোমার আলোর ওপর অন্য কারো নিরাপত্তা নির্ভর করছে, তখন তোমার ক্লান্তিগুলো নিজেই শক্তিতে রূপান্তরিত হবে।”
বাবা, আজ তুমি সেই বাতিঘরের ছোট ছেলেটির মতো। চার বছর বয়সে দাঁড়িয়ে আমি তোমাকে দেখেছিলাম নিজের একটা জগৎ বানাতে। গল্প, কল্পনা, প্রশ্ন আর আবেগে ভরা সেই জগৎ ছিল তোমার নিরাপদ আশ্রয়। পাঁচ বছরে এসে আমি দেখছি—সেই জগতে এখন আরেকজনের জন্য জায়গা তৈরি হচ্ছে। এই জায়গা করে দেওয়াটাই বড় হওয়া। তোমার ছোট বোন নিশকা তোমাকে দেখেই জগত চিনছে। তুমি যখন সত্য কথা বলবে, নিশকা সততা শিখবে; তুমি যখন ধৈর্য ধরবে, নিশকা সহনশীলতা শিখবে। দায়িত্ববোধ মানে কেবল শাসন করা নয়, বরং নিজেকে এমনভাবে গড়া যেন তোমার ছায়া অন্য কারো জন্য শীতল আশ্রয় হয়ে দাঁড়ায়।
এখন এই নির্ভেদকে দেখে আমি বিস্মিত হই। এখন তুমি আর শুধু প্রশ্ন করাতে সীমাবদ্ধ না, বরং সমস্যা সমাধান করতে চাও। তোমার চরিত্রে এখন ‘বড় ভাই’-এর এক সহজাত গাম্ভীর্য আর মমতা খেলা করে। বড় হওয়া মানে কেবল উচ্চতায় বেড়ে যাওয়া নয়, বরং মনের প্রসারতা বাড়ানো। আমি চাই তুমি এটা জেনে বড় হোও যে – স্বাধীনতা আর দায়িত্ববোধ একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ। তুমি তখনই প্রকৃত স্বাধীন, যখন তুমি নিজের কাজের দায়ভার নিতে শিখবে। তুমি হয়তো জানো না, কিন্তু ছোট বোনের দিকে তাকিয়ে তুমি যেভাবে হঠাৎ চুপ হয়ে যাও, যেভাবে খেলনার বাক্স থেকে নিজে না নিয়ে আগে তাকে কিছু দিতে চাও – সেখানেই তোমার পঞ্চম জন্মদিনের আসল গল্প লেখা হচ্ছে। দায়িত্ববোধ কখনো বক্তৃতা দিয়ে আসে না, আসে আচরণের ভেতর দিয়ে।
এই বয়সে আমি তোমাকে কোনো ভারী দায়িত্ব চাপাতে চাই না। তুমি এখনও শিশু। খেলবে, দুষ্টুমি করবে, ভুল করবে। কিন্তু আমি চাই তুমি এটুকু বুঝতে শেখো – তোমার কাজ, কথা আর সিদ্ধান্ত এখন আর শুধু তোমার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। তোমার পাশে কেউ আছে, যে তোমার দিকে তাকিয়ে শিখবে।
জীবন হয়তো একদিন তোমাকে শক্ত হতে বলবে। আমি চাই তুমি শক্ত হও, কিন্তু কঠিন নয়। বড় ভাই হওয়া মানে সবসময় জেতা নয়; কখনো কখনো ছেড়ে দেওয়া, ভাগ করে নেওয়া, আর চুপ করে পাশে দাঁড়িয়ে থাকা। এই গুণগুলোই মানুষকে বড় করে, বয়স নয়। পাঁচ বছরে দাঁড়িয়ে আমার জীবন দর্শনটা খুব সরল – যে মানুষ দায়িত্ব নিতে শেখে, সে ভয় পায় কম। কারণ দায়িত্ব মানুষকে শিকড় দেয়। তুমি যখন বোনের হাত ধরবে, তখন তুমি শুধু তাকে আগলে রাখবে না; তুমি নিজেও একটু বেশি মানুষ হয়ে উঠবে।
বাবা, আমি চাই তুমি বড় হও এমন একজন মানুষ হয়ে, যে নিজের শক্তি দিয়ে অন্যকে ছোট করে না, বরং নিজের অবস্থান ব্যবহার করে অন্যকে নিরাপদ করে। পৃথিবী অনেক সময় প্রতিযোগিতা শেখাবে; আমি চাই তুমি সহমর্মিতা শিখো। আজ তোমার পঞ্চম জন্মদিনে আমি তোমাকে কোনো নির্দেশ দিচ্ছি না। আমি শুধু একটি গল্প রেখে যাচ্ছি – বড় হওয়া মানে আগে থাকা নয়, আগে দায়িত্ব নেওয়া। যদি তুমি এই কথাটা মনে রাখতে পারো, তাহলে তুমি যেখানেই যাবে, মানুষ তোমার পাশে থাকতে চাইবে।
শুভ জন্মদিন, বাবা। তুমি আজ পাঁচ, কিন্তু তোমার ভেতরে একজন বড় মানুষের যাত্রা শুরু হয়ে গেছে। গত বছর তুমি ‘ফেইথ’ বা আস্থা শিখেছিলে, আর এই বছর তুমি সেই আস্থাকে ‘দায়িত্বে’ রূপান্তর করতে শিখেছ। তোমার ছোট বোনের হাতটি যেভাবে আজ আগলে রেখেছ, দোয়া করি সারাজীবন এভাবেই ন্যায় আর সত্যের হাতটি শক্ত করে ধরে রেখো। তোমার বাতিঘর থেকে বিচ্ছুরিত আলো যেন কেবল আমাদের ঘর নয়, বরং তোমার চারপাশের মানুষের জীবনকেও পথ দেখায়।


Discussion
No comments yet.