you're reading...
Random Thoughts

নিশকার প্রথম জন্মদিন এবং আমার মৌন হৃদয়ের শব্দহীন মহাকাব্য

পৃথিবীটা থাকনা দূরে, থাকনা নিয়ম নীতি,

তোমার-আমার বন্ধন হোক শব্দহীন এক গীতি।

হাজার কথার ভিড়েও যখন ভাষা পায় না মন,

নীরবতাই হয়ে উঠুক আমাদের শ্রেষ্ঠ আয়োজন।

জীবন নদীর প্রবহমান ধারায় কিছু মুহূর্ত আসে যা ঠিক শব্দ দিয়ে পরিমাপ করা যায় না। আজ থেকে ঠিক ৩৬৫ দিন আগে, আমাদের ঘর আর হৃদয়ের সবটুকু শূন্যতা পূর্ণ করে এসেছিলে তুমি, এক টুকরো জান্নাতী নূর – মার্জিয়া মুনতাহা হোসেন (নিশকা)। সবাই বলে, প্রথম সন্তান যখন পৃথিবীতে আসে তখন একজন মানুষের ‘বাবা’ হিসেবে জন্ম হয়। নির্ভেদের জন্মের পর আমিও যে অভাবনীয় অনুভূতির স্বাদ পেয়েছিলাম সেটি ছিলো বিস্ময়ের, দায়িত্বের, নিজের সীমা ছাড়িয়ে যাওয়ার। । কিন্তু তোমার আগমনে বুঝলাম, ‘মেয়ের বাবা’ হওয়ার অনুভূতিটা সম্পূর্ণ আলাদা, সম্পূর্ণ নতুন এক জগতের চাবি। এই অনুভূতি এতটাই তীব্র আর স্নিগ্ধ যে, এর কাছে পৃথিবীর সব গল্প, উপন্যাস আর কবিতা বড় বেশি ফ্যাঁকাসে মনে হয়।

আজ তোমার বয়স এক বছর, নিশকা। এক বছর মানে ক্যালেন্ডারের হিসাবে খুব ছোট একটি সংখ্যা। কিন্তু আমার জীবনে এই এক বছর যেন এক নতুন অধ্যায় – যার প্রতিটি পৃষ্ঠা ভরা নিঃশব্দ ভালোবাসা, গভীর আবেগ আর অদ্ভুত এক নরম শক্তিতে। মা, মাত্র এক বছরের এই ছোট্ট পথচলায় তুমি আমাদের শিখিয়েছো নিঃস্বার্থ ভালোবাসা কী এবং কীভাবে একটি শিশুর এক চিলতে হাসি পৃথিবীর সমস্ত ক্লান্তি নিমিষেই ধুয়ে দিতে পারে।

নির্ভেদ আমাকে শিখিয়েছে দায়িত্ব নিতে, কিন্তু মা তুমি আমাকে শিখিয়েছো আরও কোমল হতে। তোমার ছোট্ট হাতের আঙুল যখন আমার হাতের ওপর স্থির হয়, তখন মনে হয় পৃথিবীর সমস্ত শক্তি আমার হাতের মুঠোয়। আমি বুঝে যাই যে, এই পৃথিবীতে শক্তি মানে শুধু দৃঢ়তা নয়, শক্তি মানে কোমলতাও। তোমার হাসিতে কোনো চাওয়া নেই, কোনো হিসাব নেই – আছে শুধু নিঃশর্ত বিশ্বাস। সেই বিশ্বাসের ভারই হয়তো জীবনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। সারাদিনের ক্লান্তি শেষে তোমার এক চিলতে হাসি যেন এক নিমিষেই হৃদয়কে শান্ত করে দেয়। বড় হতে থাকা নির্ভেদের চঞ্চলতার মাঝে তুমি হচ্ছো এক শীতল বাতাসের ঝাপটা। কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের একটি লাইন খুব মনে পড়ছে – “আমার হাতের উপর তোর হাতখানি আছে— এর চেয়ে বড় কোনও স্বর্গ নেই মানুষের কাছে।”

তুমি আসার পর থেকে আমার চোখে পৃথিবীটা অনেকটাই বদলে গেছে। শব্দগুলো নরম হয়েছে… সময় ধীর হয়েছে। আগে যেসব জিনিসকে জরুরি মনে হতো, সেগুলো এখন গৌণ। এখন যেটা সবচেয়ে জরুরি সেটা তুমি। তোমার জন্মের পর আমি এক অদ্ভুত ভাষাহীন অনুভূতির মুখোমুখি হয়েছি। তোমার চোখের দিকে তাকালে আমার আর বাড়তি কোনো ভাষার প্রয়োজন হয় না। তোমার সাথে আমার যে নিবিড় যোগাযোগ, সেখানে শব্দরা বড্ড অপাঙক্তেয়। এই পরম সত্যটি উপলব্ধি করতে গিয়েই হৃদয়ে এক গভীর সুর বেজে ওঠে –

“বলা হলো না কিছুই, অথচ সবটুকু হলো জানা,

হাতের মুঠোয় হাত রেখে, শব্দ বুনে নিরবতা।”

গত ৩৬৫ দিনে তুমি আমাদের শিখিয়েছো কিভাবে প্রতিটা মুহূর্তকে উপভোগ করতে হয়। তোমার প্রথম উপুড় হওয়া, প্রথম খিলখিল করে হেসে ওঠা, কিংবা নিজের নাম ধরে ডাকলে বড় বড় চোখ করে তাকিয়ে থাকা – প্রতিটি দৃশ্য আমার স্মৃতির অ্যালবামে অমূল্য রত্ন হয়ে থাকবে। নির্ভেদও এখন ওর ‘ছোট্ট বোনটি’কে নিয়ে ভীষণ ব্যস্ত। বড় ভাইয়ের আগলে রাখার সেই চেষ্টাগুলো দেখার মধ্যেও এক পরম তৃপ্তি খুঁজে পাই। ধীরে ধীরে তুমি বড় হবে, তোমার নিজস্ব স্বপ্ন থাকবে, নিজস্ব লড়াই থাকবে। আমি জানি, একদিন আমার হাত ছেড়ে তুমি নিজেই হাঁটবে। কিন্তু আজ, এই প্রথম জন্মদিনে, আমি শুধু এটুকু বলতে চাই – তুমি যেমন আছো, ঠিক তেমনভাবেই তুমি আমার জীবনের পূর্ণতা।

“তুমি এলে বলে শব্দগুলো হঠাৎ থেমে গেল,

কারণ ভালোবাসা তখন আর বলার বিষয় রইলো না – শুধু থাকা।”

মা, তোমার সঙ্গে আমার সম্পর্কটা ঠিক এমনই। আমরা খুব বেশি কথা বলি না। তুমি এখনো শব্দ চিনো না, বাক্য গড়ো না। কিন্তু তবু সব বলা হয়ে যায়। তোমার ছোট্ট হাতটা যখন আমার আঙুলে জড়িয়ে থাকে, তখন আর কিছু বোঝানোর দরকার পড়ে না। সেই নীরব মুহূর্তে আমি বুঝে যাই – ভালোবাসা আসলে শব্দের নয়, উপস্থিতির। সেখানে প্রতিশ্রুতি উচ্চারিত না হলেও অঙ্গীকার পথ হারায় না। তুমি না জেনেই আমাকে শেখাও – সবচেয়ে গভীর অনুভূতিগুলো নীরবই থাকে, কারণ তারা জানে, বলার কিছু নেই… শুধু ধরে রাখার আছে।

‘মার্জিয়া’ শব্দের অর্থ আল্লাহর প্রিয় বা যাঁর ওপর আল্লাহ সন্তুষ্ট, আর ‘মুনতাহা’ মানে হলো উচ্চতর বা চূড়ান্ত সীমা। তুমি তোমার নামের মতোই আমাদের জীবনে আল্লাহ সন্তুষ্টির মাধ্যমে সকল সুখের চূড়ান্ত সীমা হয়ে ধরা দিয়েছো। তোমার দাদুর কাছ থেকে প্রথম যখন তোমাকে কোলে তুলে নিয়েছিলাম, সেই নরম স্পর্শে মনে হয়েছিল – মহাবিশ্বের শ্রেষ্ঠ উপহারটি এখন আমার দুই হাতের মুঠোয়।

মা নিশকা, আজ তোমার প্রথম জন্মদিন। তোমার জন্য আমার কোনো জাগতিক উপহার নেই, আছে কেবল এক বুক ভালোবাসা আর প্রার্থনা। জীবন হয়তো সব সময় মসৃণ হবে না, কিন্তু আমি চাই তুমি একজন সাহসী এবং দয়ালু মানুষ হিসেবে গড়ে ওঠো। তোমার বাবা হিসেবে আমি কথা দিচ্ছি – পৃথিবীর যে প্রান্তেই তুমি থাকো না কেন, কোনো একদিন ক্লান্ত হয়ে পেছনে তাকালে দেখবে, তোমার বাবা আর মা তোমার জন্য দু-হাত বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে আছে।

সারা ঘরময় তোমার খুদে পায়ের আওয়াজ আর ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা অগোছালো খেলনাগুলো এখন আমাদের বাড়ির সবচেয়ে সুন্দর সাজসজ্জা। তোমার ঘুমের ঘোরে মিটমিটে হাসি দেখে কত রাত যে আমরা অপলক কাটিয়ে দিয়েছি, তার হিসেব নেই। মা, তুমি যখন বড় হয়ে তোমার বাবার ব্লগের এই লেখাটি পড়বে, তখন জানবে যে – তুমিই আমাদের জীবনের সেই ধ্রুবতারা যা অন্ধকার রাতেও আমাদের পথ দেখায়। আমরা তোমাকে নিয়ে কোনো আকাশছোঁয়া উচ্চাশার বোঝা চাপাতে চাই না। শুধু চাই – তুমি একজন সত্যিকারের মানুষ হও। তোমার হৃদয়ে যেন সততা থাকে, চোখে থাকে স্বপ্ন এবং কণ্ঠে থাকে সাহসের তেজ। তুমি নামের সার্থকতা বজায় রেখে উচ্চতার শিখরে পৌঁছাও, কিন্তু তোমার শেকড় যেন মাটির সঙ্গেই থাকে।

শুভ জন্মদিন আমার ছোট্ট রাজকুমারী!

Unknown's avatar

About Md. Moulude Hossain

FinTech | Digital Payment | Product Strategy | Product Management | EMV | Business Development

Discussion

No comments yet.

Leave a comment

upay-GP Offers

Blog Stats

  • 118,566 hits

Archives

upay bonus

Recent Post