
সময় এক বিরামহীন রূপকথার গল্প। তোমার পঞ্চম জন্মদিনে ‘বাতিঘরের’ গল্পের মাধ্যমে তোমাকে ‘বড় ভাই’ হিসেবে নিজের জায়গায় স্থির থেকে আলো ছড়ানোর পাঠ দিয়েছিলাম। তখন লক্ষ্য ছিল তোমার ভেতর এক দায়িত্ববোধের জন্ম দেওয়া। আজ ষষ্ঠ জন্মদিনে এবার তোমার জীবনের ক্যানভাসে যোগ হয়েছে নতুন এক অধ্যায় – স্কুল জীবন। এবার তুমি স্কুলে পা রেখেছো! নতুন বন্ধু, নতুন শিক্ষক, নতুন বই এবং নতুন অভিজ্ঞতা। স্কুলে যাত্রা মানে কেবল শিক্ষার শুরু নয়, এটি তোমার সমাজে, মানুষের সঙ্গে এবং নিজেকে বোঝার যাত্রার সূচনা।
তুমি এখন নতুন জীবন শুরু করছো, কিন্তু মনে রেখো – প্রতিটি পাঠ, প্রতিটি বন্ধু, প্রতিটি ছোট বিষয় তোমাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলবে। তোমার স্কুলের প্রথম দিনগুলোতে তুমি হয়তো অনেক কিছু শিখবে; সংখ্যা, অক্ষর, গান, খেলা ইত্যাদি। কিন্তু সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো – মর্যাদা, ধৈর্য, সহযোগিতা এবং শ্রদ্ধা। এগুলোই তোমার জীবনের সত্যিকারের অর্জন।
তুমি প্রথম যখন ইউনিফর্ম পরে স্কুলে রওনা দাও, আমার মনে হচ্ছিল, সমাজ হয়তো এখনই তোমার হাতে একটি অদৃশ্য স্টপওয়াচ ধরিয়ে দেবে এবং বলবে – ‘ছুটো! তোমাকে সবার আগে পৌঁছাতে হবে।’ কিন্তু বাবা হিসেবে আমি তোমার জীবনের এই নতুন শুরুতে তোমাকে এক ভিন্ন মন্ত্রে দীক্ষিত করতে চাই। সেই ইচ্ছা থেকেই আজকের লিখাটি একটি খরগোশ আর একটি প্রজাপতির গল্প দিয়ে শুরু করছি।
এক বিশাল বাগানের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যাওয়ার জন্য একটি রেস বা দৌড় প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলো। খরগোশটি তার সবটুকু শক্তি দিয়ে দৌড়াতে শুরু করল। তার লক্ষ্য একটাই – সবার আগে শেষ সীমানায় পৌঁছানো। সে দৌড়ানোর সময় পথের ধারের সুন্দর ফুলগুলো দেখল না, ঘাসের ওপর ভোরের শিশিরের ঘ্রাণ নিল না, এমনকি বাতাসের শীতল স্পর্শও অনুভব করল না। সে সবার আগে গন্তব্যে পৌঁছাল এবং বিজয়ী হলো। কিন্তু জেতার পর সে দেখল, তার হাতে কেবল একটি মেডেল আছে, আর তার স্মৃতিতে আছে কেবল একরাশ ক্লান্তি।
অন্যদিকে, একটি ছোট প্রজাপতিও রওনা দিয়েছিল সেই গন্তব্যের দিকে। সে কিন্তু দৌড়ায়নি। সে প্রতিটি ফুলের ওপর বসে মধু খেল, রঙিন ডানা মেলে রোদের ঝিলিক উপভোগ করল এবং একেকটি বাঁকে নতুন নতুন বন্ধুর সাথে গল্প করল। যখন সে গন্তব্যে পৌঁছাল, তখন সূর্য ডুবছে। খরগোশটি তাকে দেখে বিদ্রূপ করে বলল, “তুমি তো অনেক দেরি করে ফেললে! আমি অনেক আগেই জিতে গিয়েছি।” প্রজাপতিটি মুচকি হেসে বলল, “তুমি হয়তো রেস জিতেছ, কিন্তু আমি জিতেছি এই সুন্দর যাত্রাটি। তুমি যখন দৌড়াচ্ছিলে, আমি তখন জীবনকে দেখছিলাম। আমার ডানাগুলো এখন ফুলের গন্ধে ম ম করছে আর আমার মনে আছে এক বাগান আনন্দ।”
বাবা, তোমার স্কুল জীবন শুরু হওয়া মানে তুমি কোনো প্রতিযোগিতার ইঁদুর দৌড়ে (Rat Race) শামিল হওয়া নয়। সমাজ হয়তো তোমাকে বলবে, “তোমাকে প্রথম হতে হবে”, “সবাইকে ছাড়িয়ে যেতে হবে”। কিন্তু আমি তোমাকে বলছি – জীবন কোনো রেস নয় যেটা জিততেই হবে; জীবন একটি যাত্রা যেটা প্রাণভরে উপভোগ করতে হয়। পড়াশোনাকে তুমি কখনোই কেবল গ্রেড বা নম্বরের খাঁচায় বন্দি কোরো না। শিক্ষা মানে হলো অজানাকে জানার আনন্দ।
তুমি যদি ক্লাসের পরীক্ষায় সবার আগে নাও থাকো, তাতে কিচ্ছু যায় আসে না—যদি তুমি একজন ভালো মানুষ হতে পারো, যদি তোমার মনটা উদার হয়। মনে রেখো, এক টুকরো কাগজ তোমার ভবিষ্যৎ নির্ধারণ করে দিবে না, তোমার জানার ইচ্ছে এবং আগ্রহই তোমাকে টিকে থাকার পথ দেখাবে। গত বছর তোমাকে শিখিয়েছিলাম ‘বাতিঘরের’ কথা। বাতিঘর কিন্তু কারো সাথে রেস দেয় না; সে নিজের জায়গায় থেকে জীবনের সমুদ্রযাত্রা উপভোগ করে এবং অন্যদের পথ দেখায়। তোমার স্কুল জীবনটাও যেন তেমনই হয়। তুমি শিখবে মানবিকতা, তুমি শিখবে বন্ধুত্ব, আর তুমি শিখবে কীভাবে ছোট ছোট মুহূর্তগুলো থেকে আনন্দ খুঁজে নিতে হয়।
আজ তুমি এক নতুন দিগন্তের যাত্রী। আমি চাই তুমি স্কুলের প্রতিটি দিন সেই প্রজাপতির মতো কাটাও। জ্ঞানের মধু আহরণ করো, বন্ধুদের সাথে স্মৃতি জমা করো এবং প্রতিবার যখন কোনো নতুন জিনিস শিখবে, তখন সেটাকে কোনো মেডেলের জন্য নয়, বরং নিজের আত্মিক সমৃদ্ধির জন্য শিখো। পড়াশোনা যেন তোমার শৈশবকে কেড়ে না নেয়। তুমি দৌড়াবে খেলার মাঠে, পরীক্ষার খাতায় নয়। তুমি প্রথম হবে মানুষের বিপদে পাশে দাঁড়াতে, কেবল ক্লাসের রোল নম্বরে নয়।
ছয় বছর বয়সে দাঁড়িয়ে আমি চাই তুমি শুধু ভালো ছাত্র না হয়ে, ভালো মানুষ হও। কেবল সাফল্য নয়, মানবিকতা, সামাজিক বোঝাপড়া, অন্যের সুখে আনন্দ – এই বিষয়গুলোই জীবনের আসল শিক্ষা। এই পথেই তুমি বড় ভাই হিসেবে, এক সন্তানের রূপে এবং সমাজের অংশ হিসেবে শক্ত হতে পারবে। আজ তোমার ষষ্ঠ জন্মদিনে আমি কোনো সংখ্যাগত অগ্রগতি চাচ্ছি না। আমি চাই তুমি প্রতিটি দিন শিখতে শিখো – পড়ালেখার মজা গ্রহণ করো, অন্যের সঙ্গে ভাগ করো, এবং নিজের জ্ঞান দিয়ে সমাজকে সমৃদ্ধ করো। কারণ জীবন শুধু দৌড় নয়; জীবন মানে শেখা, ভালোবাসা এবং দায়িত্ব নেওয়া।
আবারো শুভ জন্মদিন, প্রিয় নির্ভেদ! তোমার এই নতুন যাত্রা রোমাঞ্চকর হোক। তুমি যেন কখনোই সেই ক্লান্ত খরগোশটির মতো না হও যে জেতার নেশায় জীবনের সৌন্দর্য দেখতে ভুলে গিয়েছিল। বরং তুমি হও সেই প্রজাপতি, যে ধীরে ধীরে উড়ে বেড়ায় এবং যার প্রতিটি পাখা ঝাপটানোয় মিশে থাকে জীবনের পূর্ণতা। মনে রেখো বাবা, প্রথম হওয়াটা সাময়িক, কিন্তু একজন মানবিক ও সুখী মানুষ হওয়াটাই জীবনের আসল সার্থকতা।


Discussion
No comments yet.