
জীবন মাঝে মাঝে খুব নিঃশব্দে আমাদের শ্রেষ্ঠ উপহারগুলো দিয়ে দেয়। আজ থেকে ঠিক দুই বছর আগে যখন তুমি আমাদের কোলে এসেছিল, তখন থেকেই আমাদের ঘরে এক অদ্ভুত প্রশান্তি খেলা করে। সেই প্রশান্তি আর অনুপ্রেরণার দ্বিতীয় বসন্ত আজ। পবিত্র কোরআনে সন্তানকে বলা হয়েছে ‘কুররাতু আ’ইউন’ –অর্থাৎ ‘চোখের শীতলতা’। মা তুমি আমার কাছে ঠিক তাই। যখন বাইরের পৃথিবীর কোলাহল আর ব্যস্ততায় ক্লান্ত হয়ে ঘরে ফিরি, তখন তোমার আর নির্ভেদের ওই নিষ্পাপ হাসির সাথে তোমার দু-বছরের আধো-আধো বুলি আমার সমস্ত অবসাদ ধুয়ে দেয়।
আজ তোমার বয়স দুই বছর, নিশকা। দুই বছর মানে তুমি এখন শুধু হাঁটো না – তুমি ধীরে ধীরে আমার জীবনের ভেতর দিয়ে হেঁটে যাও। তোমার ছোট ছোট প্রশ্নহীন চোখ, অগোছালো হাসি আর হঠাৎ জড়িয়ে ধরা – সব মিলিয়ে তুমি আমার দিনের সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য দোয়া। প্রথম জন্মদিনে তুমি ছিলে নীরব বিস্ময়। আজ দ্বিতীয় জন্মদিনে তুমি গল্প হয়ে উঠছো। এমন এক গল্প, যার কোনো প্লট নেই, তবু প্রতিটি দৃশ্য হৃদয়ের গভীরে স্থায়ী হয়ে যায়।
গত বছর তোমার প্রথম জন্মদিনে আমি ভেবে পাচ্ছিলাম না কোথা থেকে শুরু করব। এই বছরও ঠিক একই দোটানায় পড়েছি। আমার এত কিছু বলার আছে, অথচ আমি জানি না শুরুটা কোথায়। তোমার শেখা প্রতিটি নতুন শব্দ নিয়ে বলব? নাকি তুমি আমার জীবনে যে অসীম আনন্দ নিয়ে এসেছ, তা নিয়ে লিখব? গত ৩৬৫ দিনে কত কী ঘটে গেল। লিখতে গেলে মনে হয় এক দীর্ঘ সময়, অথচ তোমার সাথে সময়গুলো যেন ডানায় ভর করে উড়ে যায়। মাঝে মাঝে মন চায় জীবনের ‘বিরতি’ বাটনটা টিপে ধরি, যাতে তোমার এই শৈশবকে আরও কিছুটা সময় আটকে রাখা যায়।
তুমি এখন আর সেই ছোট্ট শিশুটি নও, তুমি এখন নিজের ব্যক্তিত্বসম্পন্ন এক দুরন্ত বালিকা। তুমি কী পছন্দ করো আর কী করো না, তা খুব ভালো করেই জানো। তোমার মা আর আমি প্রায়ই বলি, তোমার ভেতরে এক অদ্ভুত মিষ্টি জেদ আছে। তোমার মা হাসিমুখে বলে, এটা নাকি আমার থেকেই পেয়েছো। আমি প্রকাশ্যে দ্বিমত করলেও মনে মনে জানি – সে ঠিকই বলেছে। তুমি একদম আমার মতো হয়েছো।
এই এক বছরে তুমি এক ‘টকিং মেশিন’ হয়ে উঠেছো। তুমি কী চাও তা পরিষ্কার করে বলার চেষ্টা করো, আর আমি বুঝতে না পারলে হাত ধরে দেখিয়ে দাও। তোমার শেখার আগ্রহ আমাকে অবাক করে। সারা দিন তুমি ব্যাস্ত থাকো তোমার পছন্দের খেলনাগুলো নিয়ে, রঙ করো (মাঝে মাঝে দেয়ালগুলোকেও রাঙিয়ে দাও!), শাহরুখ খানের ‘জওয়ান’ সিনেমার গানের তালে নাচার চেষ্টা করো। তুমি যখন হাঁটতে গিয়ে পড়ে যাও, আমি দৌড়ে যাই তোমার কাছে। তুমি কাঁদো, তারপর আবার উঠে দাঁড়াও। এই ছোট্ট দৃশ্যটাই যেন জীবনের বড় উপন্যাস। এখানে কেউ এসে হাত ধরে তোলে, কিন্তু হাঁটতে শেখে নিজেই। আমি শুধু পাশে থাকি – দূর থেকে নয়, কাছ থেকে।
আম্মা, তোমাকে আমি কতটা ভালোবাসি তা ভাষায় বর্ণনা করা অসম্ভব। তোমার জন্মের আগে আমি জানতামই না যে এমন কোনো ভালোবাসা পৃথিবীতে থাকা সম্ভব। এমন এক ভালোবাসা যা একই সাথে আমার মুখে হাসি ফোটায় আবার আনন্দের অশ্রুও এনে দেয়। শত প্রতিকূলতার মাঝেও প্রতিদিনকে সুন্দর করে তোলার নামই হলো তুমি। প্রতি রাতে যখন তুমি ঘুমিয়ে থাকো, সারাদিনে তোমার করা মজার কাজগুলো ভাবি। নির্ভেদের বাবা হওয়ার অনুভূতি যদি হয় এক বিশাল সমুদ্রের গর্জন, তবে তোমার বাবা হওয়ার অনুভূতি হলো শান্ত হ্রদের স্নিগ্ধতা।
একটি হাদিসে এসেছে – “তোমাদের প্রত্যেকেই দায়িত্বশীল এবং প্রত্যেককেই তার দায়িত্ব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে।” । এই কথাটা আমার কানে প্রতিদিন বাজে, যখন আমি তোমার হাত ধরতে যাই। আমি চাই, আমার দায়িত্ব পালনের ভেতর দিয়ে তুমি নিরাপত্তা খুঁজে পাও, কিন্তু কখনো বন্দিত্ব না পাও। দুই বছরে তুমি এখনো জীবনের অর্থ বোঝো না। কিন্তু আমি বুঝে গেছি যে তোমার জীবনের মানে যেন কেবল সফল হওয়া না হয়, বরং ভালো মানুষ হওয়াই যেন সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়। গল্পের শেষে যেমন লেখা থাকে “অতপর তারা সবাই সুখে শান্তিতে বসবাস করতে থাকলো” – আমি জানি, জীবনে সব সময় সুখ আসে না। তবু আমি আল্লাহর কাছে দোয়া করি, যেন তুমি যে পথেই যাও, সেখানে ন্যায়, দয়া আর সত্য তোমার সঙ্গী হয়।
মা, এই দুই বছরের পথচলায় সবচেয়ে সুন্দর দৃশ্য হলো তোমার বড় ভাই নির্ভেদের সাথে তোমার গড়ে ওঠা এক অদ্ভুত সখ্যতা। নির্ভেদ এখন আর কেবল বড় ভাই নয়, সে যেন নিশকার ছোট্ট এই পৃথিবীর অতন্দ্র প্রহরী। তুমি যখন প্রথম হাঁটার চেষ্টা করছো, তখন নির্ভেদ উপুড় হয়ে দু-হাত বাড়িয়ে বলত, “ভয় নেই বাবু, ভাইয়া আছি, পড়বে না।” সেই মুহূর্তে তোমার চোখে যে নির্ভয় আর বিশ্বাস দেখেছিলাম, তা কোনো উপন্যাস বা কাব্যের চেয়ে কম ছিল না। আজ দুই বছর বয়সে তোমাকে যখন আমরা বকুনি দেয়ার নাটক করি, তখন তুমি ঠিকই নির্ভেদের পিঠের আড়ালে গিয়ে লুকানোর চেষ্টা করো।

নির্ভেদ যখন বড় ভাই হিসেবে নিজের পছন্দের খেলনা বা চকোলেট যখন তোমার ছোট্ট হাতটিতে তুলে দেয়, তখন আমি বুঝতে পারি – নির্ভেদ ওর ভেতর ‘দায়িত্ব’ আর ‘ভালোবাসার’ যে বীজটি বুনেছিল, তুমি তাকে আজ পূর্ণতা দিচ্ছো। নির্ভেদের সেই ‘নির্ভয়’ আগলে রাখা আর নিশকার এই পরম ‘নির্ভরতা’ – এই দুইয়ে মিলেই আমার ঘর আজ এক টুকরো জান্নাত।
মা নিশকা, তুমি যখন এই লেখাটা পড়তে পারবে, হয়তো ভাববে – এখন পর্যন্ত লেখাগুলোর বেশিরভাগ কেন তোমার ভাইকে ঘিরে। এর কোনো বুদ্ধিদীপ্ত ব্যাখ্যা নেই। আজ তোমার এই বিশেষ দিনে আমি নিজের এবং তোমার মার পক্ষ থেকে একটি গোপন কথা স্বীকার করতে চাই। নির্ভেদ বড়, সে কথা বলতে পারে, অনেক কিছু করতে পারে যা তোমার এই বয়সে সম্ভব নয়। কিন্তু তার মানে এই নয় যে আমাদের ভালোবাসায় কোনো কমতি আছে। নির্ভেদ ইতিমধ্যে গল্প বানায়, আর তুমি – তুমি নীরবে সবকিছু বদলে দাও। এতে ভালোবাসার পরিমাপ বদলায় না। তোমরা দু’জনই সমানভাবে ভালোবাসা পাও, একই হৃদয়ের দুই ভিন্ন ছন্দ।
একদিন হয়তো তোমার জীবনে কেউ আসবে, আমি তখন একটু সন্দিহান হব – এটাই বাবাদের স্বভাব। কিন্তু যদি কখনো তোমার মন ভাঙে, মনে রেখো – বাবার দরজা সবসময় খোলা। আমি তোমাকে মাঝে মাঝে লজ্জায় ফেলব, কখনো ইচ্ছে করে, কখনো ভুলে। জীবন সবসময় ন্যায্য হয় না – এটুকু শিখে রাখো। আমি বিশ্বাস করি যে তুমি যা চাইবে, তাই হতে পারো। আমার সাধ্য অনুযায়ী আমি পাশে থাকব। তোমার পথ তোমারই, আমি কেবল আশ্রয়। আমার ভালোবাসা কোনো শর্ত জানে না। বদলাবে না। কখনোই না।
নিশকা, আমার মা, তোমার এই দ্বিতীয় জন্মদিনে আল্লাহর কাছে শুধু একটিই প্রার্থনা – তিনি তোমাকে যেন তাঁর একান্ত হেদায়েত আর হেফাজতে রাখেন। তুমি বড় হও ইসলামের সৌন্দর্যে, মানুষের প্রতি ভালোবাসায় এবং সত্যের পথে। তোমার বাবা হিসেবে আমি চাই না তুমি পৃথিবীর সব জৌলুস জয় করো, আমি শুধু চাই তুমি যেখানেই থাকো, তোমার অস্তিত্ব যেন অন্যের জীবনে শান্তির কারণ হয়।
তুমি আমার সেই নীরবতা, যা সারা বিশ্বের কোলাহলের চেয়েও বেশি সুন্দর। শুভ দ্বিতীয় জন্মদিন, আমার আম্মা নিশকা।


Discussion
No comments yet.