
আজ তোমার বয়স সাত বছর, নির্ভেদ। সাতটি বছর – অর্থাৎ আড়াই হাজারেরও বেশি দিন তুমি আমাদের ঘরকে আলো করে রেখেছ। তুমি এখন আর শুধু নতুন কিছু শিখছো না, শেখার পথে নিজের ভয়গুলোকেও চিনতে শুরু করেছো। স্কুল, পরীক্ষা, বন্ধু, প্রশ্ন, ভুল – সব মিলিয়ে এই বয়সে পৃথিবীটা একটু বড়, একটু জটিল হয়ে ধরা দেয়। আর ঠিক এখান থেকেই সাহসের আসল অর্থটা শেখা শুরু হয়। এর আগে সেই ‘প্রজাপতি ও খরগোশের’ গল্পের মাধ্যমে তোমাকে শিখিয়েছিলাম যে জীবন কোনো দৌড় নয়, বরং এক সুন্দর যাত্রা – তখন উদ্দেশ্য ছিল তোমার শৈশবকে প্রতিযোগিতার বিষবাষ্প থেকে দূরে রাখা।
গত বছর তুমি স্কুল জীবনে পা রেখেছিলে। তখন আমি তোমাকে বলেছিলাম – পড়ালেখা মানে কেবল প্রথম হওয়ার দৌড় নয়, বরং মানুষ ও সমাজকে সমৃদ্ধ করার একটি পথ। তোমার শৈশব এখন আরও পরিণত, তোমার জগত এখন আরও একটু বিস্তৃত। স্কুলের পাঠ আর বন্ধুদের সাথে মেলামেশার এই সময়ে তোমাকে এখন নতুন নতুন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হচ্ছে। তোমার কথা বলায় এখন গাম্ভীর্য এসেছে, চিন্তায় এসেছে নতুন মোড়। আজ, সপ্তম জন্মদিনে দাঁড়িয়ে সেই কথার পরের পাঠটা তোমাকে দিতে চাই – এই পথে চলতে গেলে ভয় আসবেই, আর সেটাই স্বাভাবিক। আজকে তোমার জন্য আমার উপহার সাহসিকতার এমন এক পাঠ দিতে চাই, যা কেবল বইয়ের পাতায় নয়, বরং জীবনের প্রতিটি পদক্ষেপে তোমার কাজে আসবে।
বাবা, আমি আজ তোমাকে পৃথিবীর ইতিহাসের অন্যতম সাহসী মানুষ নেলসন ম্যান্ডেলার জীবনের একটি গোপন কথা বলতে চাই। তিনি একবার বলেছিলেন, জেলখানায় থাকাকালীন প্রতিটি মুহূর্ত তিনি ভয়ে কাঁপতেন। কিন্তু তিনি সেই ভয়কে কারো সামনে প্রকাশ পেতে দেননি। ম্যান্ডেলার মতে – “আমি শিখেছি যে সাহসিকতা মানে ভয়ের অনুপস্থিতি নয়, বরং ভয়ের ওপর বিজয়।” অর্থাৎ সাহসী মানুষ সে নয় যার ভয় লাগে না, বরং সাহসী সেই যে ভয় পাওয়া সত্ত্বেও সেই ভয়ের মুখোমুখি হয়।
সিনেমা বা উপন্যাসে আমরা অনেক সময় অতিমানবদের দেখি যাদের কোনো ভয় নেই। কিন্তু বাস্তব জীবনের নায়ক তারা, যারা আমাদের মতোই সাধারণ। বিখ্যাত সিনেমা ‘আ রিঙ্কল ইন টাইম’ (A Wrinkle in Time)-এর একটি চরিত্র ‘মেগ মুরি’-এর কথা আমার মনে পড়ছে। সে যখন এক ভয়ংকর অন্ধকারের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল, তখন সে আবিষ্কার করেছিল যে – ভয় পাওয়া কোনো দুর্বলতা নয়। বরং নিজের ভয়কে স্বীকার করে নিয়ে লক্ষ্যপানে অবিচল থাকাই হলো সবচেয়ে বড় অস্ত্র।
বাবা, একটা কথা মনে রাখবে – রাত যত গভীর হয় ভোর কিন্তু ততই নিকটে আসে। তাই রাতের গভীরতার চেয়ে ভোরের এগিয়ে আসাটাই সবচেয়ে বড় শক্তির উৎস। কোথায় যেন পড়েছিলাম (উৎস মনে করতে পারছি না), কিন্তু কথাটা আমার মনে গেঁথে আছে – অন্ধকার এবং আলোর লড়াইয়ে আলোটাই বাস্তব, আলোটাই সত্য। পৃথিবীর সব অন্ধকার একসাথে হয়েও এক টুকরো আলোর রশ্মিকে আড়াল করতে পারে না। অন্ধকারটা অলীক, ক্ষণস্থায়ী। অন্ধকার থেকে নিজেকে দূরে নয়, বরং তাকে জয় করতে হবে। অনেকেই হয়তো তোমাকে বলবে, ‘ভয় পেও না, সাহসী হও’। কিন্তু আমি তোমাকে বলছি – ভয় পেয়েও ওই অন্ধকারে পা বাড়ানোই হলো সত্যিকারের সাহসিকতা।
ভয় আসলে এক ধরণের মেঘের মতো। এটি যখন সামনে আসে, তখন আমাদের ভেতরের সম্ভাবনাগুলোকে ঢেকে ফেলে। কিন্তু মজার ব্যাপার হলো, তুমি যখন সেই ভয়কে স্বীকার করে নিয়ে এক কদম সামনে বাড়াও, তখনই তোমার ভেতর থেকে এক অন্যরকম শক্তির জন্ম হয়। সেই শক্তিটি সুপ্ত অবস্থায় থাকে, তাকে জাগিয়ে তোলার একমাত্র চাবিকাঠি হলো ‘ভয়কে সঙ্গী করে হাঁটা’।
সমাজ হয়তো তোমাকে বলবে ভয়কে লুকিয়ে রাখতে। কিন্তু আমি চাই তুমি তোমার এই মানবিক অনুভূতিকে সম্মান করো। সাহসিকতা পেশিতে থাকে না বাবা, তা থাকে অন্তরের সেই অটল সিদ্ধান্তে – যেখানে তুমি নিজেকে বলো, “আমি ভয় পাচ্ছি, তবুও আমি থামব না।” প্রকৃত সাহসী তো সেই, যে ভয়কে অনুভব করে, যার হাত-পা কাঁপে, যার মনে হয় সে হয়তো পারবে না – তবুও সে নিজের লক্ষ্যে অবিচল থাকে। ভয় তোমাকে সাবধান করে, কিন্তু সাহসিকতা তোমাকে সেই বাধা টপকানোর শক্তি দেয়।
গত বছর তোমাকে শিখিয়েছিলাম ‘যাত্রাকে উপভোগ’ করতে। সেই যাত্রা সব সময় আলোকিত পথে হবে না। মাঝে মাঝে জীবন তোমাকে এমন এক অন্ধকার সিঁড়ির সামনে দাঁড় করিয়ে দেবে, যেখানে তুমি একা থাকবে এবং সামনে প্রচণ্ড ভয় থাকবে। কখনো কোনো কঠিন অংক দেখে ভয় হতে পারে, কিংবা কখনো স্টেজে দাঁড়িয়ে কথা বলতে বা নিজের ভুল স্বীকার করতে ভয় পাবে… তখন তুমি যদি পিছিয়ে আসো, তবে তুমি হেরে গেলে। কিন্তু যদি ভয় নিয়েও এক পা সামনে বাড়াও, তবেই তুমি জয়ী হলে। মনে রেখো বাবা, সাহসিকতা মানে ভয়হীনতা নয়; বরং ভয় পাওয়া সত্ত্বেও নিজের লক্ষ্যে অবিচল থেকে সামনে এগিয়ে যাওয়াই আসল সাহসিকতা।
শুভ সপ্তম জন্মদিন, প্রিয় নির্ভেদ! তোমার এই সাত বছরের পথচলা আমাদের জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অধ্যায়। তুমি এমন এক মানুষ হও, যে নিজের ভয়কে চিনতে পারে এবং তাকে জয় করতে পারে। আজ আমি কোনো বীর হওয়ার গল্প শোনাচ্ছি না। আমি তোমাকে সাধারণ মানুষের সাহসের গল্প দিচ্ছি – যেখানে ভয় আছে, দ্বিধা আছে, কিন্তু তবুও চলা থামে না। এই সাহসটাই তোমাকে বড় করবে, মানুষ করবে। গত বছরের সেই ‘প্রজাপতি’ হয়ে যেমন তুমি জীবনের ঘ্রাণ নিচ্ছো, তেমনি এই ‘সাহসী যাত্রী’ হয়ে তুমি প্রতিকূলতাকে জয় করতে শেখো।
তোমার বাতিঘরের আলো এবার সাহসিকতার নতুন এক রঙে রাঙিয়ে উঠুক। মনে রেখো, সত্যিকারের বীর সেই নয় যে কখনো পড়ে যায় না; বীর সেই যে পড়ে যাওয়ার ভয় নিয়েও বারবার উঠে দাঁড়ায় এবং নিজের সেই অমোঘ শক্তির ওপর আস্থা রেখে সামনের দিকে এগিয়ে যায়।


Discussion
No comments yet.