
নিশকা, তোমার জীবনের এই সময়টাকে আমি বলি – মৌনতার নীল আকাশ। এখানে শব্দ কম, কিন্তু অর্থ অসীম। তুমি অনেক কিছু বলো না, তবু তোমার চোখ, হাসি, হঠাৎ রাগ, আবার আচমকা জড়িয়ে ধরা… সব মিলিয়ে এক অদ্ভুত ভাষা তৈরি হয়েছে, যা কেবল হৃদয়ই বুঝতে পারে। এই নীল আকাশ পেরিয়ে আজ তোমার নতুন বসন্ত। প্রতিদিন একটু একটু করে তুমি বদলে যাচ্ছো। নতুন শব্দ শিখছো, নতুন প্রশ্ন জমছে মনে, নতুন অনুভূতি এসে ভিড় করছে তোমার আচরণে। বসন্ত যেমন হঠাৎ আসে না, তেমনই তোমার বড় হয়ে ওঠাটাও নিঃশব্দে, ধীরে ধীরে আমাদের ঘরে প্রবেশ করছে।
তিন বছরে পা রাখা তুমি এখন আর শুধু আধো-আধো কথা বলা শিশুটি নেই। তুমি এখন এক ছোট্ট কৌতূহলী অভিযাত্রী। “এটা কী?”, “ওটা কেন?”, “পাখিটা কোথায় যাচ্ছে?” – এরকম হাজারো প্রশ্নের উত্তর দিতে দিতে আমরাও যেন নতুন করে পৃথিবীটাকে আবিষ্কার করছি। তোমার এই কৌতূহলী চোখের চাহনি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, জগতটা আসলে কতটা সুন্দর এবং রহস্যময়। তোমার প্রতিটি প্রশ্নের পেছনে লুকিয়ে থাকে এক গভীর বোধ। তুমি এখন তোমার নিজের মত করে বায়না ধরতে শিখেছো, আর সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে ইতিমধ্যে আমাদের আবেগগুলো বুঝতে শিখে গেছো। আমরা একটু মন খারাপ করলে তার সেই ছোট ছোট হাতের স্পর্শ আর “কী হয়েছে?” বলে চুমু দিয়ে মন ভালো করে দেয়ার চেষ্টা… এই পরম মমতাটুকু কেনার মতো সম্পদ পৃথিবীতে দ্বিতীয়টি নেই।
তুমি এখন রঙ পেন্সিল দিয়ে হিজিবিজি এঁকে আমাদের বড় বড় গল্প শোনাও। তোমার সেই কাল্পনিক জগতে কখনো সাজো রাজকন্যা, কখনো বা বনের ছোট্ট কোনো পাখি। মার্জিয়া নামের সেই স্নিগ্ধতা তোমার স্বভাবে মিশে আছে। তোমার চারিত্রিক দৃঢ়তা আর মায়ার সংমিশ্রণ আমাদের প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করে। শৈশবের এই সময়টি বড় নির্মল, বড় পবিত্র। আমি তোমার মধ্যে এক অদ্ভুত আত্মপ্রত্যয় দেখতে পাচ্ছি। তুমি কী পরবে, কোন খেলনাটি নিয়ে খেলবে কিংবা কখন তোমার ‘একান্ত সময়’ প্রয়োজন – তা তুমি বেশ স্পষ্ট করেই বুঝিয়ে দাও। এই যে নিজের ইচ্ছা আর রুচিকে সম্মান করার প্রাথমিক ধাপ, এটাই তোমার আগামীর আত্মমর্যাদার ভিত্তি। আমি চাই না তুমি কেবল ভিড়ের মাঝে হারিয়ে যাওয়া একজন হও; বরং আমি চাই তুমি তোমার নিজস্বতা আর স্বকীয়তা বজায় রেখে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে শেখো।
ইসলামিক দর্শনে একজন নারীকে সম্মানের সর্বোচ্চ আসনে বসানো হয়েছে। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কন্যা ফাতিমা (রা.) যখন তাঁর কাছে আসতেন, তিনি উঠে দাঁড়িয়ে নিজের চাদর বিছিয়ে দিতেন। এই ঘটনাটি আমাদের শেখায় যে, একটি মেয়ের আত্মমর্যাদা এবং সম্মানবোধ কতটা সুউচ্চ হওয়া উচিত। নিশকা, তুমিও যেন সেই আভিজাত্য আর আত্মসম্মানবোধ নিয়ে বড় হও।
আমাদের ঘরটাই এখন তোমার প্রথম পাঠশালা। এখানে কোনো বেঞ্চ নেই, নেই পরীক্ষার খাতা। এখানে শেখানো হয় ভালোবাসা দিয়ে, ভুল করে, আবার চেষ্টা করে। তুমি যখন খেলনা ভেঙে ফেলো, আমরা রাগ করি না – আমরা শেখাই, ভাঙা জিনিস যেমন জোড়া লাগে, ভাঙা মনও তেমনই সেলাই করা যায়। তোমাকে কেবল শাসন নয়, বরং স্বাধীনতার স্বাদ দেয়ার চেষ্টা থাকে। তোমার বড় ভাই নির্ভেদ তোমাকে শিখিয়েছে কীভাবে ভাগ করে নিতে হয়, আর তুমি তাকে শিখিয়েছো কীভাবে ধৈর্য ধরতে হয়। আমাদের এই পারিবারিক বন্ধনটি কোনো নিয়মের শিকল নয়, বরং একটি নিরাপদ আশ্রয়।
কথায় আছে, মানুষের ব্যক্তিত্বের গভীরতা মাপা যায় তার নীরবতা দিয়ে। আমাদের সেই বিশেষ ভাষাটি তোমার তিন বছরে এসে আরও পরিণত হয়েছে। আজও যখন আমরা একে অপরের দিকে তাকাই, আমাদের সেই চিরচেনা সুরটি হৃদয়ে প্রতিধ্বনিত হয়। শব্দের চেয়েও তোমার এই নীরব স্থিরতা আমাকে বেশি মুগ্ধ করে। তোমার চোখের সেই আত্মবিশ্বাসী চাউনি আমাকে আশ্বস্ত করে যে, তুমি জীবনের প্রতিটি ধাপে নিজের মর্যাদা রক্ষা করতে জানবে। কবিতার ভাষায় যদি তোমাকে ধরি—
“তুমি তিন বছরের একটি সকাল,
যার আলোতে আমার ক্লান্ত সন্ধ্যাগুলো জেগে ওঠে।
তুমি ছোট্ট পায়ে হাঁটা একটি দোয়া,
যা প্রতিদিন আমার জীবনের দিকে এগিয়ে আসে।”
আমি আর তোমার মা সবসময় চেষ্টা করি তোমার সামনে এমন এক পৃথিবী তুলে ধরতে, যেখানে সততা আর বিনয়ই হচ্ছে শ্রেষ্ঠ অলঙ্কার। তুমি যেন শিখতে পারো যে, বিনয়ী হওয়া মানে দুর্বল হওয়া নয়, বরং নিজের ওপর পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ থাকা। সন্তান আল্লাহর পক্ষ থেকে আমানত। সেই আমানতকে গড়ে তোলার জন্য সবচেয়ে বড় বিদ্যালয় হলো ঘর। এখানে বাবা-মা শুধু অভিভাবক নয়, তারা শিক্ষকও। তাদের পাঠ্যসূচিতে থাকে দয়া, ধৈর্য, ন্যায় আর সত্য। অন্যদিকে তোমার মৌনতাই আমাদের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। তুমি চুপ করে বসে থাকলে আমরা শিখি – সব প্রশ্নের উত্তর শব্দে দিতে হয় না। কখনো কখনো পাশে বসে থাকাই যথেষ্ট।
তুমি যখন জেদ ধরো, আমি বিরক্ত হই। কিন্তু পরে বুঝি, এই জেদই একদিন তোমাকে অন্যায়ের সামনে মাথা নত না করতে শেখাবে। আমি শুধু চাই, সেই জেদ যেন ন্যায়ের পথে থাকে। উপন্যাসের মতো করে যদি ভবিষ্যৎ কল্পনা করি – একদিন তুমি অনেক দূরে যাবে, নিজের গল্প নিজেই লিখবে। আমি তখন এই তিন বছরের নিশকাকেই মনে রাখবো – যে নির্ভয়ে আমার দিকে তাকিয়ে বলতো, “পাপা, আমি পারবো।”
এই ঘরোয়া পাঠশালায় আমরা তোমাকে প্রথম হওয়া শেখাতে চাই না। আমরা শেখাতে চাই – সমাজে গুরুত্বপূর্ন হওয়া ভালো, কিন্তু ভালো হওয়াটা বেশী গুরুত্বপূর্ন। মা, মনে রেখো জিতে যাওয়ার আগে মানুষ হয়ে ওঠা জরুরি। তুমি যদি কখনো পড়ে যাও, আমরা তোমাকে উঠতে সাহায্য করবো, কিন্তু হাঁটাটা তোমাকেই শিখতে হবে।
আম্মা, একদিন এই নীল আকাশ পেরিয়ে তুমি অনেক দূরে যাবে। তখন এই বসন্ত, এই ঘর, এই পাঠশালা – সবই স্মৃতি হবে। কিন্তু যদি তোমার ভেতরে থেকে যায় দয়া, সাহস আর সত্যের আলো… তবে জানবো, আমাদের পাঠশালা সফল হয়েছিল। তুমি আমাদের ঘরের বসন্ত। আর আমরা – নীরবে তোমার বড় হয়ে ওঠা দেখার সৌভাগ্য পাওয়া দুইজন শিক্ষার্থী। তোমার এই নতুন বসন্ত হোক আত্মমর্যাদা ও অনাবিল আনন্দের।


Discussion
No comments yet.