
বাবা দেখতে দেখতে আটটি বছর পার হয়ে গেল। বিগত বছরগুলোতে প্রতিটি জন্মদিনে আমি তোমার বেড়ে ওঠা নিয়ে লিখার চেষ্টা করেছিলেম – কখনো প্রথম হাঁটা, কখনো আধো-আধো বুলি, আবার কখনো তোমার কৌতূহলী চোখের পৃথিবী দেখার গল্প। আজ আট বছরে পা দিয়ে তুমি যখন শৈশব থেকে কৈশোরের পথে এক ধাপ এগিয়ে যাচ্ছো, তখন তোমাকে জীবনের খুব জরুরি একটি সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করাতে চাই।
আট বছর মানে তুমি এখন ফলাফল বুঝতে শিখছো। কে জিতল, কে হারল, কে প্রথম হলো – এই হিসাবগুলো তোমার চোখে এখন পরিষ্কার। আর ঠিক এই বয়সেই একটি ভুল ধারণা খুব সহজে জন্ম নিতে পারে – সাফল্য বুঝি একদিনে আসে, আর হার মানেই সব শেষ। আজ তোমার অষ্টম জন্মদিনে আমি এই ধারণাটাকেই একটু ভেঙে দিতে চাই। গত কয়েক বছরে তুমি ধীরে ধীরে বড় হয়েছো… পঞ্চম জন্মদিনে তুমি শিখেছিলে দায়িত্ব নেওয়ার মানে। ষষ্ঠ জন্মদিনে তুমি শিখেছিলে – পড়ালেখা কেবল দৌড় নয়, বরং মানুষ হওয়ার পথ। সপ্তম জন্মদিনে তুমি জেনেছিলে – ভয় থাকা সত্ত্বেও সামনে এগোনোর নামই সাহস। এবার সেই শিক্ষাগুলোর সঙ্গে যোগ হচ্ছে আরেকটি গভীর সত্য – সাফল্য কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়, এটি একটি দীর্ঘ যাত্রার ফল।
আমরা প্রায়ই সাফল্যকে এক রাতের জাদুকরী কোনো অর্জন বলে মনে করি। কিন্তু সাফল্যের ইমারত দাঁড়িয়ে থাকে অসংখ্য ব্যর্থতার ধ্বংসাবশেষের ওপর। অনেক সময় আমরা শুধু শেষ ফলটা দেখি। কিন্তু ফলের আগে যে অসংখ্য চেষ্টা, ভুল, হার আর অপেক্ষা থাকে সেগুলো চোখে পড়ে না। তুমি যদি শুধু জয় দেখো, তাহলে হার তোমাকে ভেঙে দিতে পারে। কিন্তু যদি হারকে শেখার অংশ হিসেবে দেখো, তাহলে হারই একদিন তোমাকে জয়ের কাছে পৌঁছে দেবে। হেরে যাওয়া মানেই পথের শেষ নয়। বরং হারের পর নিজের লক্ষ্যে অটুট থাকা এবং সততার সাথে নিজের কাজ করে যাওয়াই হলো সফলতার মূলমন্ত্র।
বাবা, আজকে কোন কাল্পনিক গল্প নয়, বরং তোমার সাথে আমার প্রিয় দুইজন মানুষের হার না মানার গল্প শেয়ার করব। এদের মধ্যে একজন হচ্ছেন কিংবদন্তী ক্রিকেটার শচীন রমেশ টেন্ডুলকার। বিশ্ব ক্রিকেটের সর্বকালের সবচেয়ে সফল একজন ব্যাটসম্যান। যার কিংবদন্তী তার পরবর্তী প্রজন্মগুলোর জন্য ছিলো অনুপ্রেরণার মহাকাব্য। ব্যাক্তিগত সব অর্জন যখন পদতলে, তখন শুধু একটি বিশ্বকাপ ছিলো তার কাছে অধোরা। শচীন একটি বিশ্বকাপ ডিজার্ভ করেন – এটি সম্ভবত তার চরম প্রতিদন্ধী খেলোয়াড়ও বিশ্বাস করতেন। ২০১১ সালের ক্রিকেট বিশ্বকাপের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার সাথে হেরে রানার্সআপ হিসেবে শেষ করেন যাত্রা। তবে সেই বিশ্বকাপে শচীন কিন্তু টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড় নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু সেই অর্জন হাতেও শচীনকে ঘীরে ছিলো রাজ্যের হতাশা। এরপর ২০০৭ সালের বিশ্বকাপে প্রথম রাউন্ড থেকে ভারত বিদায় নিলে অনেকেই মনে করেছিলেন বিশ্ব ক্রিকেটে শচীন নামের মহাকাব্যের শেষটা হতে যাচ্ছে সেই কাঙ্খিত বিশ্বকাপ জয়ের অধরা স্বপ্নের মোড়কে।
কিন্তু শচীনের মত কিংবদন্তীরা হারকে মেনে নেন, কিন্তু হেরে যাওয়ার কাছে নিজেকে সমর্পন করে দেন না। তিনি খেলা এবং চেষ্টা চালিয়ে গেলেন। পাঁচটি বিশ্বকাপ তিনি খেলেছেন, ব্যর্থ হয়েছেন, কিন্তু হাল ছাড়েননি। অবশেষে ২০১১ সালে তার কাছে ধরা দিলো সেই কাঙ্খিত মহেন্দ্রক্ষন। সব শঙ্কা আর অনিশ্চয়তাকে পিছনে ফেলে তিনি ট্রফি উঁচিয়ে ধরলেন। সেই সাফল্য কেবল এক দিনের জয় ছিল না; সেটি ছিল দুই দশকেরও বেশি সময়ের হার না মানা লড়াইয়ের ফসল। যেই প্রজন্ম তাকে দেখে ক্রিকেট ভালোবেসেছে, ক্রিকেটকে আপন করে নিয়েছে, সেই প্রজন্মই ছিলো সেদিন তার সহযোদ্ধা। তাদের কাধে চরেই শচীন নিজেকে আবিষ্কার করলেন এক মহাকাব্যের নায়কের চরিত্রে।
একই ধারার গল্পের আরেক মহানায়কের নাম নিওলেন আন্দ্রেস মেসি – বিশ্ব ফুটবলের সর্বকালের সেরা খেলোয়াড় হিসেবে যাকে মেনে নিয়েছেন অনেকেই। তবে এই ফুটবল জাদুকর মেসির গল্পটা আরও বেশি আবেগের। ছোটবেলায় শারীরিক সমস্যার কারণে অনেকেই ভেবেছিল – সে পারবে না। কিন্তু অমিত সম্ভাবনার কারনে স্প্যানিশ ফুটবল ক্লাব বার্সেলোনা তাদের সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিলো মেসির দিকে। এই ক্লাবের অর্থায়নে মেসি নিশ্চিত করলেন বিশ্ব ফুটবলে নতুন অধ্যায়ের। কৃতজ্ঞতা স্বরূপ নিজেকে উজার করে দিয়েছেন ক্লাবের জন্য। বার্সেলোনাকে তিনি পরিণত এক অপ্রতিরোধ্য ক্লাবে, জিতেছেন সব ব্যাক্তিগত পুরষ্কার। ক্লাবের হয়ে যিনি সাফল্যকে বানিয়েছিলেন ছেলেখেলা, সেই মেসিই কিনা ব্যার্থ জাতীয় দল আর্জেন্টিনার জার্সিতে। একসময় অনেকেই তাকে শুধুমাত্র একজন ক্লাব কিংবদন্তী হিসেবে আখ্যায়িত করতে শুরু করলেন।
তিনটি কোপা আমেরিকা ফাইনাল এবং একটি বিশ্বকাপ ফাইনালে হার! এমনকি জাতীয় দল থেকে অভিমানে অবসরের ঘোষণা। নিজের দেশ আর্জেন্টিনার হয়ে খেলার জন্য ফিরিয়ে দিয়েছিলেন স্পেন জাতীয় দলের প্রস্তাব। অতচ এক সময় সেই দেশের মানুষের চক্ষুশূল হলেন মেসি। তার বিরুদ্ধে রাজপথে মিছিল হলো, তার কুশপুত্তলিকা জ্বালানো হলো, আর্জেন্টিনার মিডিয়াগুলো তাকে ‘ফ্রড’ এবং দেশদ্রোহী উপাধি দিলো। বার্সেলোনার হয়ে খেলায় যিনি ছিলেন অন্য গ্রহের ফুটবলার, আর্জেন্টিনার জার্সিতে তিনিই হলেন ব্যর্থতার পরিভাষা।
২০১৪ সালে অনেকটা একক নৈপূন্যে আর্জেন্টিনাকে নিয়ে গেছেন বিশ্বকাপের ফাইনালে। কিন্তু ব্রাজিলের মারাকানায় সেই রাত আবারো মেসির জন্য হয়ে উঠেছিলো ট্রাজ্যাডির। সেই বিশ্বকাপে তিনি জিতেছিলেন ‘গোল্ডেন বল’ (পুরো টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়)। সেদিন গোল্ডেন বল হাতে অধরা বিশ্বকাপের ট্রপির পাশ দিয়ে মলিন মুখে তার হেটে আসার ছবিটা এখন এক মহাকাব্যে প্রতিরুপ। সেই বিশ্বকাপের পরই দুইটি কোপা আমেরিকা ফাইনাল হেরেছেন মেসি, কেঁদেছেন মাঠে বসে। হতাশা হয়ে বললেন, “জাতীয় দলে আমার জন্য আর কিছু নেই, আমি জাতীয় দল থেকে অবসরের ঘোষণা দিচ্ছি”। তার সেই ঘোষণা আর্জেন্টিনাকে যতটা হতাশ করেছিলো, তার চেয়ে বেশী করেছিলো ফুটবল প্রেমীদের। লিওনেল স্কালোনি থেকে আর্জেন্টিনার সাধারণ মানুষ সবাই তখন বলতে শুরু করলেন – তুমি যেও না মেসি!
হ্যাঁ, তিনি দলে ফিরেছিলেন! আর তার সেই ফিরে আসার ম্যাচটাও ছিলো একটুকরো ইতিহাস। ২০১৮ সালের বিশ্বকাপে খেলার সুযোগ পেতে হলে যে ম্যাচে আর্জেন্টিনাকে জিততেই হবে সে ম্যাচে তিনি ফিরলেন। ইকুরেডরের বিপক্ষ্যে ইকুয়েডরের নিজেদের মাঠে সেই খেলায় প্রথম মিনিটেই এক গোল হজম করে আর্জেন্টিনা। আর মেসি গল্পটা শুরু হয় তারই একটু পর থেকে… সেই ম্যাচে হ্যাট্রিক করে তিনি নিশ্চিত করেন আর্জেন্টিনার বিশ্বকাপ যাত্রা। তবে ২০১৮-এর বিশ্বকাপ ছিলো অতীত বিশ্বকাপগুলোর অভিজ্ঞতার চেয়েও খারাপ। মাত্র দ্বিতীয় রাউন্ডেই ফ্রান্সের কাছে হেরে বিদায় নেন মেসি। সেদিন খেলার ধারাভাষ্যকার ঘোষণাই দিয়ে দিলেন – বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচটি খেলে ফেললেন লিওনেল মেসি। বিশ্বকাপ জেতা ছাড়াই সমাপ্ত হলো এই কিংবদন্তীর যাত্রা।
তবে মেসি এবং ঈশ্বর ভাবছিলেন অন্যকিছু। ২০২২ বিশ্বকাপেও মেসি আসলেন! তবে এবার পুরপুরি ভিন্ন এক পরিচয় এবং চেতনায়। শচীনের মত মেসিও তার পরবর্তী প্রজন্মের গরম রক্তের একঝাক তরুণ নিয়ে আসলেন বিশ্বকাপের মঞ্চে। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ঘোষণা দিলেন – মেসির জন্য গোল পোষ্টে জীবন দিতে প্রস্তুত তিনি। রদ্রিগো ডি’পল শারীরিকভাবে নিশ্চিত করলেন মাঠে মেসিকে স্পর্ষ করার আগে তাকে মোকাবেলা করতে হবে। আলভারেজ, ম্যাক এলিস্টার কিংবা লাওতারো মার্তিনেজ ঘোষণা দিলেন – মেসির হয়ে রক্ত জড়াবেন তারা। এতকিছুর পর ২০২২ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনা হেরে যায় সৌদি আরবের মত ছোট দলের বিপক্ষ্যে। আবারো যখন সবদিকে হায় হায়, মেসি বললেন – আমাদের উপর ভরষা রাখুন!
সম্ভবত এর পরের ঘটনাগুলো আরব্য রজনির অনেক গল্পকেও হার মানাবে। বার্সেলোনার ‘আনকারা মেসি’ হয়ে উঠলেন বিশ্ব মঞ্চে ফুটবল নান্দনিকতার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। পুরো বিশ্বকাপে তার অসাধারণ নৈপুণ্য এবং গোল পোষ্টে বাজপাখি এমি মার্তিনেজের অতিমানবীয় রক্ষণ আর্জেন্টিনাকে করলো বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পাশাপাশি মেসি জিতলেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরষ্কার। মেসির বিশ্বকাপ জেতার উম্মাদনা ছড়িয়ে পরলো আর্জেন্টিনার রাজধানী শহর বুয়েনোস আইরেসের রাজপথ থেকে বাংলাদেশের টিএসসি পর্যন্ত। শেষ পর্যন্ত লুসাইল স্টেডিয়ামে ট্রফি হাতে মেসির সেই হাসি আমাদের শেখায় – সাফল্য একদিন আসে ঠিকই, তবে তা আসে তখন, যখন তুমি প্রায় হাল ছেড়ে দিতে চেয়েও আবার ঘুরে দাঁড়াও।
এই গল্পগুলো তোমাকে একজন ক্রিকেটার বা ফুটবলার বানানোর জন্য নয়। এই গল্পগুলো তোমাকে শেখানোর জন্য – জীবনে হার আসবেই। পরীক্ষায়, খেলায়, বন্ধুত্বে, স্বপ্নে… প্রশ্ন হলো, হারলে তুমি থামবে, নাকি আরও মনোযোগ দিয়ে সামনে এগোবে? নির্ভেদ, আমি চাই তুমি হেরে যেতে শিখো, কিন্তু হাল ছেড়ে দিতে নয়। সততার সঙ্গে নিজের কাজ করে যাও। ফল আসতে দেরি হতে পারে, কিন্তু পরিশ্রম কখনো হারায় না। সাফল্য একদিন আসে – যখন তুমি প্রায় হাল ছেড়ে দিতে চাও, ঠিক তার একটু পরেই।
তোমার অষ্টম জন্মদিনে আমার জীবনদর্শনটা খুব সহজ – হার শেষ নয়, হার হলো প্রস্তুতি। যে মানুষ হারকে সম্মান করতে শেখে, সে মানুষই সাফল্যকে ধারণ করার যোগ্য হয়। কারন, হারকে মেনে নিয়ে আবার শুরু করার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে আগামীর সাফল্যের গল্পগাথা।


Discussion
No comments yet.