
বাংলাদেশের স্বাধীনতা দৃশ্যমান! আমাদের আছে নিজস্ব সরকার, অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। কিন্তু এই দৃশ্যমান স্বাধীনতার আড়ালে নব্যলিবারেল নীতির মাধ্যমে বাংলাদেশ আটকে আছে অদৃশ্য শাসনের বেড়াজালে। বৈশ্বিক নিওকলোনিজম (প্রথম পর্ব) এবং বাংলাদেশ প্রেক্ষিতে এর প্রাসঙ্গিকতা মূলে আছে এই অস্বস্তিকর বাস্তবতা। এটা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে, আমরা উন্নয়ন করেছি। কিন্তু এই উন্নয়ন দাঁড়িয়ে আছে কয়েকটি অত্যন্ত সংবেদনশীল স্তম্ভের ওপর – রপ্তানি, রেমিট্যান্স ও বিদেশি অর্থায়ন। বিশ্ববাজারে সামান্য ঝাঁকুনি এলেই দেশের ভেতরে তার অভিঘাত অনুভূত হয়ে গভীরভাবে।
উন্নয়নের এই প্রশ্নে প্রায়শই বলা হয় – “এটাই একমাত্র পথ”। কিন্তু দৃশ্যমান এই উন্নয়ের চেয়ে আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হচ্ছে, আমাদের উন্নয়ন আলোচনায় বিকল্প চিন্তার দুর্বলতা। এই মানসিকতাই নিওকলোনিজমের সবচেয়ে বড় সাফল্য। কারণ যখন বিকল্প কল্পনাই করা যায় না, তখন শাসন হয়ে উঠে সবচেয়ে সহজ। উদাহরণস্বরূপ, মাইক্রোফাইন্যান্স এবং এনজিওগুলোকে “দারিদ্র্যমোচন” বলে প্রচার করা হয়, কিন্তু এগুলো নব্যলিবারেল মডেলের অংশ। এর মাধ্যেম দারিদ্র্যকে স্থায়ী করে সর্বোচ্চ কর্পোরেট মুনাফা নিশ্চিত করা হয়ে থাকে। প্রতিষ্ঠানগুলো বিশ্বব্যাংকের মডেলের পরিপূরক হিসেবে কাজ করে, যা দারিদ্র্যকে বজায় রেখে নতুন বাজার তৈরি করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে নিওকলোনিজমের আরেকটি উদাহরণ হলো শিক্ষা ব্যবস্থা। প্রাইভেট স্কুল এবং ইংরেজি ভাষা প্রোগ্রামগুলো নব্যঔপনিবেশিক সাক্ষরতা প্রচার করে, যা শিক্ষার্থীদের মনকে colonise করে। এতে স্থানীয় সংস্কৃতি এবং ভাষা অবহেলিত হয় এবং বিদেশী মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠিত হয়। রাজনৈতিকভাবে, ভারতের মতো প্রতিবেশী দেশের প্রভাবও নব্যঔপনিবেশিক। সাম্প্রতিক ঘটনায়, ভারতের হস্তক্ষেপ বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, যা ঔপনিবেশিক কৌশলের মতো।
ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইন-এর World-System Theory বা “বৈশ্বিক কাঠামো তথ্য” অনুযায়ী নিওকলোনিজমকে বুঝতে হলে পৃথিবীকে আলাদা আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি একক বিশ্ব-পদ্ধতি হিসেবে দেখতে হবে। এই পদ্ধতিকে তিনটি স্তরে বিভক্ত করা হয়েছে – Core (কেন্দ্র), Semi-Periphery (আধা-প্রান্ত) এবং Periphery (প্রান্ত)। World-System Theory-এর আলোকে দেখলে বাংলাদেশ পুরোপুরি প্রান্তিক নয়, আবার কেন্দ্রও নয়। আমরা একটি semi-peripheral অবস্থানে আছি। আমাদের শিল্প আছে, কিন্তু প্রযুক্তি ও ব্র্যান্ড নেই। আমাদের শ্রমশক্তি আছে, কিন্তু মুনাফার নিয়ন্ত্রণ নেই। গার্মেন্টস শিল্প এর সবচেয়ে স্পষ্ট উদাহরণ। আমরা উৎপাদন করি, কিন্তু মূল্য নির্ধারণ করে অন্যরা। এটি নিওকলোনিজমের ক্লাসিক চিত্র – শ্রম এখানে, ক্ষমতা বাইরে।
বর্তমান প্রেক্ষিতে বাংলাদেশের সামনে সবচেয়ে চ্যালেঞ্জ এখন আর “উন্নয়ন বনাম অনুন্নয়ন” নয়, বরং মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে কী ধরনের উন্নয়ন। নিওকলোনিয়াল বিশ্বব্যবস্থায় উন্নয়ন মানে বৈশ্বিক বাজারে আরও গভীরভাবে যুক্ত হওয়া, আরও বেশি প্রতিযোগিতামূলক হওয়া, আরও সস্তা হওয়া। এই মডেল কিছু প্রবৃদ্ধি তৈরি করে ঠিকই, কিন্তু একই সঙ্গে তৈরি করে দীর্ঘমেয়াদি নির্ভরতা।
নিওকলোনিয়ালিজমের বাংলাদেশী উদাহরণ
নিওকলোনিয়ালিজম (Neocolonialism) বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে একটি বিতর্কিত কিন্তু গভীরভাবে আলোচিত বিষয়। স্বাধীনতার পর বিভিন্ন সময় বাংলাদেশ অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে বিভিন্ন বহিরাগত শক্তির প্রভাবের মুখোমুখি হয়েছে, যেগুলোকে অনেক বিশ্লেষক নিওকলোনিয়ালিজম হিসেবে চিহ্নিত করেন। এখানে কয়েকটি প্রধান উদাহরণ তুলে ধরা হলো, যা বিভিন্ন গবেষণা, প্রতিবেদন ও মতামত থেকে উঠে এসেছে:
১. IMF এবং World Bank-এর Structural Adjustment Programs (SAPs) ও ঋণের শর্তাবলী
বাংলাদেশ ১৯৮০-এর দশক থেকে IMF এবং World Bank-এর কাছ থেকে বিপুল ঋণ নিয়েছে, যার সাথে যুক্ত ছিল কঠোর শর্তাবলী (conditionalities)। এগুলোর মধ্যে:
- রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণ,
- বাজার উন্মুক্তকরণ,
- সামাজিক খাতে (শিক্ষা, স্বাস্থ্য) ব্যয় কমানো,
- কৃষি ও শিল্পে বিদেশী বিনিয়োগকে অগ্রাধিকার।
এই শর্তগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতিকে বিদেশী কর্পোরেশনের নিয়ন্ত্রণে নিয়ে যায় এবং দারিদ্র্য-অসমতা বাড়ায়। অনেকে এটিকে “ঋণের ফাঁদ” (debt trap) হিসেবে দেখেন, যা নিওকলোনিয়ালিজমের একটি ক্লাসিক রূপ—কারণ IMF/World Bank-এর ভোটিং পাওয়ার গ্লোবাল নর্থের হাতে (যেমন: একজন ব্রিটিশের ভোট একজন বাংলাদেশীর চেয়ে ৪১ গুণ বেশি মূল্যবান)। ফলে বাংলাদেশের নীতি নির্ধারণে পশ্চিমা স্বার্থ প্রাধান্য পায়।
২. চীনের Belt and Road Initiative (BRI) এবং “Debt-Trap Diplomacy”
বাংলাদেশ BRI-এর অধীনে চীন থেকে বিপুল ঋণ নিয়েছে (পদ্মা সেতু রেল লিঙ্ক, রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র, বিভিন্ন অবকাঠামো প্রকল্প)। সম্প্রতি (২০২৪-২০২৫) বাংলাদেশ চীনের কাছে $৫ বিলিয়নের মতো সফট লোন চেয়েছে, যা বৈদেশিক মুদ্রা সংকট মোকাবিলা করতে। কিন্তু সমালোচকরা বলেন এটি “debt-trap” সৃষ্টি করছে—যেখানে ঋণ পরিশোধ না হলে সম্পদ (বন্দর, জমি) নিয়ন্ত্রণ চীনের হাতে চলে যেতে পারে (শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দরের মতো)। বাংলাদেশের ঋণের বড় অংশ চীনের কাছে, এবং এটি অর্থনৈতিক স্বাধীনতা হরণ করে রাজনৈতিক প্রভাব বাড়ায়।
৩. ভারতের প্রভাব এবং “Indian-style Neocolonialism”
ভারতের সাথে বাংলাদেশের ঘনিষ্ঠ সম্পর্কের মধ্যে অনেকে নিওকলোনিয়াল উপাদান দেখেন। উদাহরণ:
- তিস্তা পানি বণ্টন চুক্তি না হওয়া,
- বাণিজ্য অসমতা (ভারতীয় পণ্যের প্রভাব),
- রাজনৈতিক হস্তক্ষেপের অভিযোগ (শেখ হাসিনার সরকারকে সমর্থন দেওয়া)।
কিছু বিশ্লেষক বলেন, ভারত বাংলাদেশকে “প্রতিবেশী নিয়ন্ত্রণ” করে রাখতে চায়, যা colonial-style dominance-এর মতো।
৪. NGO এবং মাইক্রোফাইন্যান্সের “কর্পোরেটাইজেশন”
গ্রামীণ ব্যাংক, BRAC-এর মতো NGO-গুলো বিশ্বব্যাংক, বিদেশী কর্পোরেশনের সাথে যৌথ উদ্যোগে গঠিত হয়ে থাকে (যেমন: Grameen Phone-এ Telenor-এর ৬২% শেয়ার, Grameen Veolia Water-এ পানি বেসরকারিকরণের প্রকল্প)। এই প্রতিষ্ঠানগুলো দরিদ্র বিমোচনের নামে কর্পোরেট সম্প্রসারণ করে, যা নিওলিবারেল নিওকলোনিয়ালিজমের উদাহরণ।
৫. সাংস্কৃতিক ও শিক্ষাগত নিওকলোনিয়ালিজম
প্রাইভেট স্কুল এবং ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষা ব্যবস্থা বাংলাদেশী ছাত্রদের মনে “অ্যাসিমিলেটিভ” (অনুকরণমূলক) মানসিকতা তৈরি করে, যা postcolonial বিশ্লেষণে নিওকলোনিয়াল বলে চিহ্নিত। এছাড়া পরিবেশগত প্রকল্প (যেমন: হাতিরঝিল) এবং শহর পরিকল্পনায় colonial sensibility-এর প্রভাব দেখা যায়।এই উদাহরণগুলো দেখায় যে, বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভ করলেও অর্থনৈতিক নির্ভরতা, ঋণের চাপ এবং বহিরাগত প্রভাবের মাধ্যমে নিওকলোনিয়ালিজমের শিকার হয়েছে। সত্যিকারের স্বাধীনতার জন্য স্বনির্ভর অর্থনীতি, দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা (BRICS-এর মতো) এবং স্থানীয় মডেলের উপর জোর দেওয়া জরুরি।
নিওকলোনিজম-বিরোধী উন্নয়ন ফ্রেমওয়ার্ক
নিওকলোনিজম-বিরোধী উন্নয়ন ফ্রেমওয়ার্কের মূল লক্ষ্য তাই প্রবৃদ্ধি নয়, বরং অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক স্তরে ক্ষমতার ভারসাম্যের পরিবর্তন। এই বিষয়গুলো নিয়ে একটু বিস্তারিত আলোচনার চেষ্টা থাকবে এখানে।
১. উন্নয়নকে পুনঃসংজ্ঞায়িত করা: প্রবৃদ্ধি নয়, সক্ষমতা
নিওকলোনিয়াল উন্নয়ন মডেলের সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো GDP, রপ্তানি আয় ও বৈদেশিক বিনিয়োগের মাধ্যমে উন্নয়নকে সংকুচিত করা। এরফলে রাষ্ট্র ধীরে ধীরে মানুষকে নয়, বাজারকে সন্তুষ্ট করার যন্ত্রে পরিণত হয়।
বাংলাদেশের নিওকলোনিজম-বিরোধী পথ শুরু হতে হবে উন্নয়নের সংজ্ঞা বদলানোর মাধ্যমে। উন্নয়ন মানে হবে এমন একটি প্রক্রিয়া, যেখানে রাষ্ট্রের সক্ষমতা বাড়ে। নিজস্ব সিদ্ধান্ত নেওয়া এবং নিজস্ব শিল্প রক্ষার মাধ্যমে জনগণের জীবনের মান নিয়ন্ত্রণ করার সক্ষমতা।
এই দৃষ্টিভঙ্গি অমর্ত্য সেনের Capability Approach-এর সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ, কিন্তু এখানে একটি রাজনৈতিক সংযোজন দরকার – সক্ষমতা শুধু ব্যক্তির নয়, রাষ্ট্র ও সমাজেরও।
২. উৎপাদনের ওপর নিয়ন্ত্রণ: সস্তা শ্রম থেকে প্রযুক্তিগত ক্ষমতায়ন
নিওকলোনিজম টিকে থাকে উৎপাদনের বিভাজনের মাধ্যমে। বৈশ্বিক অর্থনীতিতে বাংলাদেশকে মূলত দেখা হয় একটি শ্রমনির্ভর উৎপাদন অঞ্চল হিসেবে। যতদিন আমরা এই ভূমিকাতেই আটকে থাকবো, ততদিন আমরা বিশ্ব-পদ্ধতির প্রান্তিক বা আধা-প্রান্তিক অবস্থানেই থাকবো। নিওকলোনিজম-বিরোধী ফ্রেমওয়ার্ক এখানে একটি স্পষ্ট অবস্থান নেয়, আর তা হলো বাংলাদেশের উন্নয়নের কেন্দ্র হতে হবে ভ্যালু চেইনের নিয়ন্ত্রণ।
এর অর্থ শুধু শিল্প বাড়ানো নয়, বরং প্রযুক্তি, ডিজাইন, ব্র্যান্ডিং ও বাজার-নির্ধারণ ক্ষমতার দিকে ধীরে ধীরে অগ্রসর হওয়া। দক্ষিণ কোরিয়া বা তাইওয়ানের ইতিহাস ঘাঁটলে দেখা যায় যে, এই পথেই বিশ্ব-পদ্ধতির ভেতরে নিজেদের অবস্থান বদলাতে পেরেছে দেশগুলো। সস্তা উৎপাদন দিয়ে শুরু করে রাষ্ট্রীয় নীতি দিয়ে ধীরে ধীরে তারা কর্পোরেট ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা তৈরি করেছে।
বাংলাদেশের জন্য এর প্রতিপাদ্য হলো – রাষ্ট্রকে আবার উন্নয়নের সক্রিয় অভিনেতা হতে হবে, শুধু বাজারের রেফারি নয়।
৩. রাষ্ট্রের ভূমিকা পুনর্গঠন: Facilitator নয়, Strategic Actor
নিওকলোনিয়াল চিন্তায় রাষ্ট্রকে প্রায়ই অদক্ষ ও সমস্যা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। বলা হয়, বাজার নিজেই সব ঠিক করে দেবে। এই ধারণা বাস্তবে উন্নয়নশীল দেশগুলোকে নীতিগতভাবে দুর্বল করেছে। নিওকলোনিজম-বিরোধী ফ্রেমওয়ার্ক রাষ্ট্রকে দেখে ভিন্নভাবে। এখানে রাষ্ট্র হলো দীর্ঘমেয়াদি দিকনির্দেশক, কৌশলগত বিনিয়োগকারী এবং জাতীয় স্বার্থের রক্ষক।
তবে এর মানে এই নয় যে রাষ্ট্র সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করবে, বরং রাষ্ট্র নির্ধারণ করবে কোন খাতে বাজার ব্যবস্তা কার্যকর থাকবে, আর কোন খাতে জাতীয় সক্ষমতা তৈরি করা অগ্রাধিকার পাবে। এটি মূলত “শক্ত রাষ্ট্র” নয়, বরং একটি কৌশলী রাষ্ট্রের রূপরেখা।
৪. বৈদেশিক সম্পর্ক: নির্ভরতা নয়, কৌশলগত বহুমুখিতা
বিচ্ছিন্নতা নয় বরং নিওকলোনিজম-বিরোধী উন্নয়ন মানে হলো বহুমুখী ও দরকষাকষিভিত্তিক বৈদেশিক সম্পর্ক। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এর অর্থ – একটি একক শক্তি বা একক বাজারের ওপর অতিরিক্ত নির্ভরতা কমানো। বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তিতে বিকল্প তৈরি করা। ইতিহাস দেখায়, যে রাষ্ট্রগুলো নিজেদের জন্য বিকল্প পথ তৈরি করতে পেরেছে, তারাই নিওকলোনিয়াল চাপ মোকাবিলা করতে পেরেছে।
এই ফ্রেমওয়ার্কে কূটনীতি শুধু পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের বিষয় নয়; এটি অর্থনীতি, শিল্পনীতি ও প্রযুক্তিনীতির সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত।
৫. জ্ঞান ও ন্যারেটিভের স্বাধীনতা: চিন্তার উপনিবেশ ভাঙা
নিওকলোনিজমের সবচেয়ে গভীর স্তরটি বুদ্ধিবৃত্তিক। যতদিন আমরা নিজেদের সমস্যা অন্যের ভাষায় ব্যাখ্যা করবো, ততদিন সমাধানও আসবে বাইরে থেকে। নিওকলোনিজম-বিরোধী উন্নয়ন ফ্রেমওয়ার্ক জোর দেয় মূলত স্থানীয় গবেষণা, নিজস্ব উন্নয়ন তত্ত্ব এবং প্রেক্ষিতভিত্তিক জ্ঞানের ওপর।
বিশ্বব্যাংকের রিপোর্ট নয়, বরং বাংলাদেশের ইতিহাস, সমাজ ও বাস্তবতা – এইগুলো হতে হবে নীতিনির্ধারণের ভিত্তি। এটি কোনো জাতীয়তাবাদী আবেগ নয়; এটি বুদ্ধিবৃত্তিক সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন।
৬. শ্রেণি ও সামাজিক ন্যায়: উন্নয়নের রাজনৈতিক ভিত্তি
Dependency Theory আমাদের শিখিয়েছে যে, নিওকলোনিজম টিকে থাকে স্থানীয় এলিটদের সহযোগিতায়। তাই নিওকলোনিজম-বিরোধী উন্নয়ন কখনোই শ্রেণি প্রশ্ন এড়িয়ে যেতে পারে না। যে উন্নয়ন মডেল সামাজিক বৈষম্য বাড়ায়, তা শেষ পর্যন্ত বৈশ্বিক পুঁজির ওপর আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কারণ দুর্বল সমাজ সহজে নিয়ন্ত্রিত হয়। বাংলাদেশের উন্নয়ন যদি টেকসই ও স্বাধীন হতে হয়, তবে সেটি অবশ্যই শ্রম, সামাজিক সুরক্ষা ও ন্যায্য বণ্টনের প্রশ্নকে কেন্দ্রে রেখে সাজাতে হবে।
এটি নিছক নৈতিক প্রশ্ন নয়; এটি একটি কৌশলগত প্রয়োজন।
বাংলাদেশের নব্যঔপনিবেশিক বাস্তবতা অস্বস্তিকর, কারণ এটি স্বাধীনতার স্বপ্নকে প্রশ্নবিদ্ধ করে। মুক্তিযুদ্ধে পাকিস্তানের নব্যঔপনিবেশিক রাষ্ট্রের ব্যর্থতা প্রকাশ পেয়েছে, কিন্তু স্বাধীনতার পরও একই ধরনের শোষণ চলমান আছে।
এছাড়া, পোস্ট-কলোনিয়াল সমাজে রাষ্ট্রের ভূমিকা নব্যঔপনিবেশিক বুর্জোয়াদের স্বার্থ রক্ষা করে, যা বাংলাদেশ এবং পাকিস্তানের মতো দেশে দেখা যায়। এখন বাংলাদেশের দরকার একটি সুস্পষ্ট নীতি – উন্নয়ন মানে অবস্থান বদলানোর চেষ্টা!
নিওকলোনিজম-বিরোধী উন্নয়ন ফ্রেমওয়ার্ক কোনো রোমান্টিক বিকল্প নয়। এটি নিশ্চিত করে যে, বাংলাদেশ বিশ্ব-পদ্ধতির ভেতরেই আছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটি প্রশ্ন তোলে – আমরা কি এই ব্যবস্থার মধ্যে শুধু মানিয়ে নেবো, নাকি ধীরে ধীরে নিজের অবস্থান বদলানোর চেষ্টা করবো?
Marx আমাদের শিখিয়েছেন শোষণের যুক্তি, Dependency Theory দেখিয়েছে নির্ভরতার কাঠামো এবং World-System Theory দেখিয়েছে বৈশ্বিক মানচিত্র। বাংলাদেশের কাজ এখন তত্ত্বকে বাস্তবতায় রূপ দেওয়া – যেখানে উন্নয়ন মানে শুধু বড় হওয়া নয়, বরং নিজের মতো করে দাঁড়াতে শেখা।
আরো পড়ুনঃ নিওকলোনিজম – প্রাসঙ্গিক ভাবনা।


Discussion
Trackbacks/Pingbacks
Pingback: রাষ্ট্র স্বাধীন, ক্ষমতা বন্দী: নিওকলোনিজমের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক ক্ষমতার অদৃশ্য কাঠামো | - February 3, 2026
Pingback: রাষ্ট্র স্বাধীন, ক্ষমতা বন্দী: নিওকলোনিজমের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক ক্ষমতার অদৃশ্য কাঠামো | - February 3, 2026