you're reading...
Economics

রাষ্ট্র স্বাধীন, ক্ষমতা বন্দী: নিওকলোনিজমের রাজনৈতিক অর্থনীতি ও বৈশ্বিক ক্ষমতার অদৃশ্য কাঠামো

বিশ শতকের মাঝামাঝি সময়ে উপনিবেশগুলো একে একে স্বাধীনতা অর্জন করে! ইউরোপীয় শক্তিগুলো সামরিকভাবে পিছু হটল, মানচিত্রে নতুন নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হলো। এশিয়া, আফ্রিকা ও লাতিন আমেরিকার মানুষ ভেবেছিল তারা এখন নিজের ভবিষ্যৎ নিজেরা লিখবে। কিন্তু ঔপনিবেশিকতার পতনের ইতিহাস একটি স্পষ্ট রেখায় সীমাবদ্ধ থেকে গেছে – একটি নির্দিষ্ট বছর, একটি নতুন পতাকা, একটি নতুন সংবিধান। এই গল্পটা এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে মনে হয়, শাসনও বুঝি সেদিনই শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু বাস্তবিকতা হচ্ছে ইতিহাস কখনো এত সরল সমীকরণ মেনে চলে না। ক্ষমতা এবং এর প্রভাব খুব কমই হঠাৎ বিদায় নেয়; বরং সে রূপ বদলায়, ভাষা বদলায়, কৌশল বদলায়।

কাগুজে স্বাধীনতার কয়েক দশক না যেতেই এই অস্বস্তিকর বাস্তবতা সবার সামনে আসতে শুরু করে। সবাই উপলব্ধি করে যে, শাসক চলে গেলেও এর প্রভাব রয়ে গেছে শাসনের নতুন ধরনে। আরও সূক্ষ্ম ও অদৃশ্য কাঠামোর মাধ্যমে ক্ষমতা নতুন রুপ ধারণ করে। নিওকলোনিজম মূলত সেই রূপান্তরিত ক্ষমতার নাম।

স্বাধীনতা অর্জন করলেও খুব দ্রুত দেশগুলো বুঝতে শুরু করে যে রাষ্ট্র স্বাধীন হলেও অর্থনীতি, রাজনীতি এবং চিন্তার ওপর তাদের নিয়ন্ত্রণ সীমিত। ঘানার প্রথম প্রেসিডেন্ট কোয়ামে নক্রুমা এই বাস্তবতাকে প্রথম তাত্ত্বিক ভাষা দেন “নিওকলোনিজম” নামে। তাঁর কাছে নিওকলোনিজম মানে ছিল এমন এক অবস্থা, যেখানে একটি দেশ বাহ্যিকভাবে স্বাধীন, কিন্তু তার অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক জীবন পরিচালিত হয় বাইরে থেকে। তাঁর সতর্কবার্তা আজও প্রাসঙ্গিক, কারণ এই শাসন চোখে দেখা যায় না, কিন্তু এর শেকড় অনেক গভীরে।

নিওকলোনিজম প্রসঙ্গে আলোচনায় প্রথম যে ভুলটি প্রায়ই করা হয়, তা হলো একে নৈতিক ভাষায় ব্যাখ্যা করা – ভালো রাষ্ট্র বনাম খারাপ রাষ্ট্র, শোষক বনাম শোষিত। কিন্তু নিওকলোনিজম কোনো নৈতিক বিচ্যুতি নয়; এটি একটি ঐতিহাসিক ও কাঠামোগত বাস্তবতা। এই বাস্তবতাকে বুঝতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হয় রাজনৈতিক অর্থনীতির মূল তত্ত্বগুলোর কাছে। বিশেষ করে কার্ল মার্ক্স এবং তাঁর উত্তরাধিকারী চিন্তাধারায়, যেখানে নিওকলোনিজমের মৌলিক বিষয়গুলো উঠে এসেছে নিখুঁতভাবে।

মার্ক্স: পুঁজিবাদ, সম্প্রসারণ এবং উপনিবেশ

কার্ল মার্ক্স কখনো “নিওকলোনিজম” শব্দটি ব্যবহার করেননি, কিন্তু তাঁর বিশ্লেষণ ছাড়া নিওকলোনিজম বোঝা অসম্ভব। মার্ক্সের কাছে পুঁজিবাদ কোনো স্থির ব্যবস্থা নয়; এটি একটি চির-সম্প্রসারণশীল ব্যবস্থা। মুনাফা টিকিয়ে রাখতে পুঁজিকে নতুন বাজার, নতুন শ্রম এবং নতুন সম্পদের সন্ধান করতে হয়। উপনিবেশবাদ ছিল এই সম্প্রসারণের ঐতিহাসিক রূপ। শিল্প বিপ্লবের পর ইউরোপীয় পুঁজিবাদ যে কাঁচামাল, শ্রম ও বাজারের প্রয়োজন অনুভব করেছিল, উপনিবেশ ছিল তার সমাধান। ভারত, আফ্রিকা কিংবা লাতিন আমেরিকা শুধু শাসিত অঞ্চল ছিল না; এগুলো ছিল পুঁজিবাদের কাঁচামাল ও শ্রমের ভাণ্ডার।

মার্ক্স দেখিয়েছিলেন, পুঁজিবাদের শোষণ শুধু শ্রমিকের ওপর নয়, বরং পুরো অঞ্চল ও সমাজের ওপরও প্রয়োগ করা যায়। উপনিবেশিক শাসন শেষ হলেও পুঁজিবাদের এই বৈশ্বিক যুক্তি শেষ হয়নি। এখান থেকেই জন্ম নেয় নিওকলোনিজম!

Dependency Theory: অনুন্নয়ন কোনো দুর্ঘটনা নয়

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর বহু দেশ স্বাধীন হলো। তখন একটি বড় প্রশ্ন উঠে এলো – যদি উপনিবেশই দারিদ্র্যের মূল কারণ হয়, তবে স্বাধীনতার পর কেন এই দেশগুলো দ্রুত উন্নত হলো না? এই প্রশ্ন থেকেই জন্ম নেয় Dependency Theory। এই থিওরির এর মূল বক্তব্য ছিল বিপ্লবাত্মক। আন্দ্রে গুন্ডার ফ্রাঙ্ক, সামির আমিন ও ফার্নান্দো কারদোসোর মতো চিন্তাবিদরা বলেন – উন্নয়নশীল দেশগুলো “পিছিয়ে” নেই, বরং তারা উন্নত দেশগুলোর উন্নয়নের জন্য কাঠামোগতভাবে বাধাগ্রস্ত।

এই তত্ত্ব অনুযায়ী, বিশ্ব অর্থনীতি একটি অসম সম্পর্কের ওপর দাঁড়িয়ে আছে। কেন্দ্রীয় দেশগুলো (উন্নত রাষ্ট্র) শিল্পজাত পণ্য, প্রযুক্তি ও পুঁজি নিয়ন্ত্রণ করে, আর প্রান্তিক দেশগুলো (উন্নয়নশীল রাষ্ট্র) কাঁচামাল ও সস্তা শ্রম সরবরাহ করে। এই সম্পর্ক বদলায় না, কারণ পুরো ব্যবস্থাই তৈরি হয়েছে এবং দাঁড়িয়ে আছে এই সমীকরণে। Dependency theorists দেখান, যখন একটি উন্নয়নশীল দেশ বিশ্ববাজারে যুক্ত হয়, তখন সে নিজের মতো করে শিল্পায়ন করতে পারে না। কারণ এখানে প্রযুক্তি আসে বাইরে থেকে, বাজার নিয়ন্ত্রিত হয় বাইরে থেকে এবং মুনাফার বড় অংশ চলে যায় বাইরে। এটি নিওকলোনিজমের অর্থনৈতিক ব্যাখ্যা। এখানে শাসন নেই, কিন্তু নির্ভরতা আছে। রাষ্ট্র স্বাধীন, কিন্তু উন্নয়ন পরনির্ভর।

World-System Theory: বৈশ্বিক কাঠামো হিসেবে নিওকলোনিজম

ইমানুয়েল ওয়ালারস্টেইন Dependency Theory-কে আরও বিস্তৃত করে গড়ে তোলেন World-System Theory। তাঁর মতে, পৃথিবীকে আলাদা আলাদা রাষ্ট্র হিসেবে নয়, বরং একটি একক বিশ্ব-পদ্ধতি হিসেবে দেখতে হবে। এই পদ্ধতিতে তিনটি স্তর আছে – Core (কেন্দ্র), Semi-Periphery (আধা-প্রান্ত) এবং Periphery (প্রান্ত)।

Core দেশগুলো প্রযুক্তি, জ্ঞান, আর্থিক ব্যবস্থা ও রাজনৈতিক নীতি নিয়ন্ত্রণ করে। Periphery দেশগুলো সরবরাহ করে শ্রম ও কাঁচামাল। Semi-periphery দেশগুলো দুইয়ের মাঝখানে, যেখানে কিছু শিল্প আছে, কিন্তু পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ নেই। নিওকলোনিজম এই বিশ্ব-পদ্ধতির স্বাভাবিক ফল। কারণ এখানে কোনো দেশ ইচ্ছা করলেই অবস্থান বদলাতে পারে না। পুরো কাঠামো এমনভাবে তৈরি যে Core দেশগুলোর আধিপত্য টিকে থাকে।

রাষ্ট্র, শ্রেণি এবং স্থানীয় এলিট

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে – যদি নিওকলোনিজম বাইরের শক্তির ফল হয়, তবে স্থানীয় শাসক শ্রেণির ভূমিকা কী? এখানেই মার্ক্সবাদ আবার ফিরে আসে। Dependency theorists দেখান, নিওকলোনিজম টিকে থাকে স্থানীয় এলিটদের সহযোগিতায়। এই এলিট শ্রেণি বৈশ্বিক পুঁজির সঙ্গে যুক্ত হয়ে নিজের দেশের ভেতরে মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা পালন করে। যার ফলে রাষ্ট্র হয়ে ওঠে দ্বিমুখী – উপরে বৈশ্বিক পুঁজির কাছে জবাবদিহি আর নিচে জনগণের ওপর নিয়ন্ত্রণ। এটিই হচ্ছে নিওকলোনিজমের রাজনৈতিক কাঠামো।

এই তথ্যগুলো আরো গভীরভাবে পর্যালোচনা করলে নিওকলোনিজমের একাধিক শ্রেণী বা ধারা পাওয়া যায়। কারন এটি একক কোন কৌশল নয়, বরং নিওকলোনিজমকে শক্তিশালী রুপ দিতে একটি দেশকে কয়েকভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। এই কৌশলগুলো শুধুমাত্র অর্থনৈতিক বা রাজনৈতিক কাঠামর মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। নিওকলোনিজমের মূল আঙ্গিকগুলো নিয়ে এখন কথা বলবো –

অর্থনৈতিক ক্ষমতার নতুন বিন্যাস

নিওকলোনিজমের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে অর্থনীতি। উপনিবেশিক যুগে যে সম্পর্কটি ছিল কাঁচামাল রপ্তানি ও শিল্পজাত পণ্য আমদানির, স্বাধীনতার পরেও সেই কাঠামো প্রায় অপরিবর্তিত রয়ে গেছে। পার্থক্য শুধু এটুকু – আগে এটি চাপিয়ে দেওয়া হতো সামরিক ও প্রশাসনিক শক্তির মাধ্যমে, এখন তা আসে ঋণ, বিনিয়োগ ও বাজারনীতির ভাষায়।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর গড়ে ওঠা আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠানগুলো (বিশেষ করে IMF ও World Bank) উন্নয়নশীল দেশগুলোর জন্য একটি নির্দিষ্ট উন্নয়ন পথ নির্ধারণ করে দেয়। এই পথকে বলা হয় Structural Adjustment বা কাঠামোগত সংস্কার। এই প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের নিরপেক্ষ উন্নয়ন অংশীদার হিসেবে উপস্থাপন করলেও বাস্তবে তারা একটি নির্দিষ্ট দর্শন বহন করে। এই দর্শনের মূল কথা হলো – রাষ্ট্র যত ছোট হবে, বাজার তত বড় হবে; সামাজিক সুরক্ষা যত দুর্বল হবে, বিনিয়োগ তত আকর্ষণীয় হবে। এই ধারণা ১৯৮০-এর দশকে লাতিন আমেরিকা ও আফ্রিকার ওপর যে প্রভাব ফেলেছিল, তা আজ অর্থনৈতিক ইতিহাসের একটি অন্ধকার অধ্যায়।

লাতিন আমেরিকার দিকে তাকালেই বিষয়টি পরিষ্কার হয়। ১৯৮০-এর দশকে মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা, ব্রাজিল – সব দেশই ঋণের ফাঁদে পড়ে IMF-এর শরণাপন্ন হয়। শর্ত ছিল প্রায় একরকম –  সরকারি খরচ কমাতে হবে, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান বেসরকারিকরণ করতে হবে, বাজার খুলে দিতে হবে বহুজাতিক কোম্পানির জন্য ইত্যাদি। স্বল্পমেয়াদে অর্থনীতি “স্থিতিশীল” হলো, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদে দেখা গেল শিল্প দুর্বল, বেকারত্ব এবং ভয়াবহ সামাজিক বৈষম্য।

আফ্রিকায় এই চিত্র আরও নির্মম। জাম্বিয়া বা ঘানার মতো দেশগুলো স্বাধীনতার পর নিজেদের শিল্প গড়তে চেয়েছিল। কিন্তু ঋণ ও বাজারচাপের কারণে তারা আবার ফিরে গেল কাঁচামাল রপ্তানির পুরোনো কাঠামোতে। অর্থাৎ, উপনিবেশিক যুগে যেমন তারা তামা বা কোকো রপ্তানি করত, স্বাধীনতার পরেও তাই করছে – শুধু মালিক বদলেছে, কাঠামো বদলায়নি। এর মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় শিল্প ধ্বংস হয়েছে, কর্মসংস্থান সংকুচিত হয়েছে এবং একটি ছোট কর্পোরেট শ্রেণি বিপুলভাবে লাভবান হয়েছে। অর্থনীতি বড় হয়েছে, কিন্তু সমাজ দুর্বল হয়েছে। এটি নিওকলোনিজমের সবচেয়ে সূক্ষ্ম বৈশিষ্ট্য – উন্নয়ন হয়, কিন্তু সেই উন্নয়ন ক্ষমতার ভারসাম্য বদলায় না।

রাজনীতি: সিদ্ধান্তের স্বাধীনতা কি আদৌ আছে?

নিওকলোনিজমের রাজনৈতিক দিকটি আরও জটিল। অনেকে বলেন “আমাদের তো সংসদ আছে, সরকার আছে, নির্বাচন আছে। তাহলে নিওকলোনিজম কোথায়?” – সমস্যাটা এখানেই। নিওকলোনিজম সরাসরি সরকারের পতন ঘটায় না, বরং সরকারকে এমন এক কাঠামোর ভেতর কাজ করতে বাধ্য করে, যেখানে “বাস্তবসম্মত” সিদ্ধান্তের পরিসর খুব সংকীর্ণ। এখানে সরকার উৎখাত করা হয় না, সংবিধান বাতিল করা হয় না।

আজ অনেক উন্নয়নশীল দেশে বাজেট প্রণয়ন বা অর্থনৈতিক সংস্কার এমনভাবে হয়, যেন কিছু সিদ্ধান্ত আগেই লেখা থাকে। এক্ষেত্রে IMF-এর রিপোর্ট দেখা হয় রাষ্ট্রীয় ডকুমেন্টের মতো গুরুত্ব দিয়ে।  ভর্তুকি কমাতে হবে, রাষ্ট্রীয় খাত সংকুচিত করতে হবে, শ্রমবাজারকে নমনীয় করতে হবে – এই কথাগুলো প্রায় স্বতঃসিদ্ধ সত্য হিসেবে হাজির হয়। সবকিছুতেই একটি নির্দিষ্ট আদর্শ চাপিয়ে দেওয়া হয় – বাজারই সবচেয়ে দক্ষ, রাষ্ট্রকে ছোট হতে হবে। এই আদর্শকে প্রশ্ন করলে বলা হয় – “বাস্তবতা এটাই, বিকল্প নেই”। বিকল্প প্রস্তাব এলেই সেটিকে বলা হয় অবাস্তব, আদর্শবাদী বা বাজারবিরোধী।

নিওকলোনিজমের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে সরকার নির্বাচিত হলেও অনেক সময় প্রকৃত সিদ্ধান্তগ্রহণকারী না হয়ে একধরনের প্রশাসনিক ব্যবস্থাপকে পরিণত হয়। রাজনৈতিক ক্ষমতা থাকে, কিন্তু নীতিগত সার্বভৌমত্ব সীমিত হয়ে যায়। ফরাসি দার্শনিক মিশেল ফুকোর ভাষায় বললে – এটি ক্ষমতার এমন এক রূপ, যা সরাসরি শাসন করে না, বরং কীভাবে শাসন করা উচিত, সেটাই নির্ধারণ করে দেয়। আর এটিই নিওকলোনিজমের রাজনৈতিক সাফল্য – ক্ষমতা প্রয়োগ না করেও সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করা।

কর্পোরেট সাম্রাজ্য ও রাষ্ট্রের সংকোচন

একবিংশ শতাব্দীতে নিওকলোনিজমের সবচেয়ে দৃশ্যমান বাহন হলো বহুজাতিক কর্পোরেশন। অনেক কর্পোরেশনের আর্থিক সক্ষমতা আজ বহু দেশের রাষ্ট্রীয় বাজেটের চেয়েও বড়। এই শক্তি যখন উন্নয়নশীল দেশের বাজারে প্রবেশ করে, তখন রাষ্ট্র নিজেই প্রতিযোগিতায় নামে – কে কম কর দেবে, কে বেশি ছাড় দেবে।

এই প্রতিযোগিতায় রাষ্ট্র ধীরে ধীরে নাগরিকের রক্ষক থেকে বিনিয়োগের দালালে পরিণত হয়। শ্রমিকের অধিকার, পরিবেশগত নিরাপত্তা, সামাজিক ন্যায় – সবকিছুই হয়ে পড়ে “কস্ট ফ্যাক্টর”। উপনিবেশিক যুগে যেমন রাষ্ট্র কাজ করত সাম্রাজ্যের স্বার্থে, নিওকলোনিয়াল যুগে রাষ্ট্র অনেক সময় কাজ করে কর্পোরেটের স্বার্থে।

বুদ্ধিবৃত্তিক নিওকলোনিজম: চিন্তার উপনিবেশ

নিওকলোনিজমের সবচেয়ে গভীর স্তরটি অর্থনীতি বা রাজনীতি নয়, বরং জ্ঞান ও চিন্তা। কোন উন্নয়ন মডেল গ্রহণযোগ্য, কোন রাষ্ট্র সফল, কোন সমাজ পিছিয়ে – এই বিচারগুলো নিরপেক্ষ নয়। এগুলো নির্ধারিত হয় নির্দিষ্ট ক্ষমতাকেন্দ্র থেকে। পশ্চিমা বিশ্ববিদ্যালয়, থিঙ্ক ট্যাংক ও মিডিয়া যে জ্ঞান উৎপাদন করে, সেটিই বৈশ্বিক মানদণ্ড হয়ে ওঠে। স্থানীয় বাস্তবতা, ঐতিহাসিক অভিজ্ঞতা বা সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপটকে প্রায়শই তুচ্ছ করে দেখা হয়। ফলে উন্নয়নশীল দেশগুলো শুধু অর্থনীতিতে নয়, চিন্তাতেও অনুসারী হয়ে পড়ে।

এই বুদ্ধিবৃত্তিক নিওকলোনিজমের ফল হলো – আমরা নিজের সমস্যাও দেখি অন্যের চোখ দিয়ে। নিজের সমাজের জন্যও খুঁজি আমদানি করা সমাধান।

নিওকলোনিজম ভাঙা কি সম্ভব?

Marx, Dependency Theory এবং World-System Theory আমাদের একটি কঠিন সত্য শেখায় – নিওকলোনিজম কোনো ভুল নীতি নয়, এটি একটি পুরো ব্যবস্থা। এই ব্যবস্থা ভাঙতে হলে শুধু ভালো সরকার নয়, দরকার – উৎপাদনের ওপর নিয়ন্ত্রণ, জ্ঞানের ওপর নিয়ন্ত্রণ এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, বিকল্প কল্পনা করার সাহস।ইতিহাস দেখায়, যারা কিছুটা সফল হয়েছে যেমন দক্ষিণ কোরিয়া, চীন, ভিয়েতনাম – তারা এই কাঠামোর সঙ্গে সংঘর্ষে গেছে, পুরোপুরি আত্মসমর্পণ করেনি।

উপসংহার: নিওকলোনিজম বোঝা মানে প্রতিরোধের শুরু

নিওকলোনিজমকে বোঝা মানে শুধু অভিযোগ করা নয়; বরং নিজের অবস্থানকে বৈজ্ঞানিকভাবে চিনে নেওয়া। মার্ক্স আমাদের শিখিয়েছেন শোষণের যুক্তি, Dependency Theory দেখিয়েছে বৈশ্বিক নির্ভরতার কাঠামো, আর World-System Theory দেখিয়েছে সেই কাঠামোর মানচিত্র। নিওকলোনিজমের প্রশ্ন তাই এখন আর আবেগের নয়, তত্ত্বের – আমরা এই বিশ্ব-পদ্ধতিতে কেবল অংশগ্রহণকারী হব, নাকি অবস্থান বদলানোর চেষ্টা করবো?

এই প্রশ্নের মধ্যেই লুকিয়ে আছে নিওকলোনিজম-উত্তর রাজনীতির সম্ভাবনা।

আরো পড়ুনঃ নিওকলোনিজম – বাংলাদেশ প্রেক্ষিত

Unknown's avatar

About Md. Moulude Hossain

Digital Transformation Leader | FinTech & Digital Payments Strategist | Product Management | Business Case Architect

Leave a comment

Eduva IELTS

Blog Stats

  • 121,608 hits

Archives

upay bonus

Recent Post