you're reading...
Economics

“ইকনোমিক হিট ম্যান” — অর্থনীতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতার কারিগর

Economic Hitman

সম্প্রতি জন আব্রাহাম অভিনীত “মাদ্রাজ ক্যাফে” সিনেমা দেখতে গিয়ে নতুন (আমার কাছে) একটি শব্দ আমাকে বেশ আগ্রহী করে তোলে, তা হলো “ইকনোমিক হিট ম্যান”। এই সিনেমাটি, যা ১৯৯১ সালে ভারতের প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধীর হত্যাকাণ্ডের পটভূমিতে নির্মিত, গোয়েন্দা এবং রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের মধ্য দিয়ে এই শব্দটিকে উপস্থাপন করে। সিনেমার ঘটনাপ্রবাহে এটি এমনভাবে ব্যবহৃত হয় যে, উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতি, রাজনীতি এবং সামাজিক কাঠামোকে বিদেশী শক্তিগুলো কীভাবে নিয়ন্ত্রণ করে তা স্পষ্ট হয়।

আমি ধারণা করেছিলাম যে এই শব্দটির ব্যাপ্তি এবং প্রভাব উন্নয়নশীল দেশগুলোর অর্থনীতির অন্যতম প্রধান পরিমাপক, কিন্তু বিস্তারিত অনুসন্ধানে বুঝলাম এটি কলোনিয়ালিজমের ঐতিহাসিক ধারাবাহিকতা এবং আধুনিক নিও-কলোনিয়ালিজমের একটি শক্তিশালী হাতিয়ার। পরবর্তিতে “ইকনোমিক হিট ম্যান” নিয়ে বিস্তারিত পড়ার প্রয়াসে যখন ঘাঁটাঘাঁটি শুরু করি, তখন এই বিষয়ের উপর একটি আত্নজীবনিমূলক বইয়ের সন্ধান পাই। বইটি পড়া শুরুর আগের প্রস্তুতি হিসেবে “ইকনোমিক হিট ম্যান” নিয়ে আমার স্বল্প পরিসরে জানতে পারা কিছু বিষয় নিয়ে নিজের চিন্তাগুলো গোছানোর চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু এখন তা আরও বিস্তৃত করার সুযোগ পেলাম –ঐতিহাসিক এবং রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট যোগ করে।

জন পার্কিন্সের লেখা “কনফেশনস অফ এ ইকোনমিক হিট ম্যান” (২০০৪ সালে প্রকাশিত) একটি আন্তর্জাতিক বেস্টসেলার, যার আরও দুটি পর্ব – “দ্য সিক্রেট হিস্টরি অফ দ্য আমেরিকান এম্পায়ার” (২০০৭) এবং “হুডউইঙ্কড: অ্যান ইকোনমিক হিট ম্যান রিভিলস হোয়াই দ্য গ্লোবাল ইকোনমি ইমপ্লোডেড – অ্যান্ড হাউ টু ফিক্স ইট” (২০০৯)ইতিমধ্যে প্রকাশিত হয়েছে। এই বইটিতে পার্কিন্স, যিনি নিজে একসময় “ইকনোমিক হিট ম্যান” (EHM) হিসেবে কাজ করেছেন, গ্লোবাল সাউথের দেশগুলির বিরুদ্ধে গ্লোবাল নর্থ (প্রধানত যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় শক্তিগুলো) এবং তাদের স্বার্থের প্রতিনিধিত্বকারী সংস্থাগুলোর দ্বারা মোতায়েন করা ক্ষতিকারক এবং ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক কৌশল সম্পর্কে বিস্তারিত আলোচনা করেন। পার্কিন্সের মতে, তিনি ১৯৭০-এর দশকে চ্যাস টি. মেইন নামক একটি কনসালটিং ফার্মে কাজ করতেন, যেখানে তাঁকে যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল সিকিউরিটি এজেন্সি (NSA) দ্বারা নিয়োগ করা হয়। তাঁর কাজ ছিল উন্নয়নশীল দেশগুলোর নেতাদের সাথে যোগাযোগ করে, অত্যধিক ঋণ গ্রহণের জন্য উত্সাহিত করা, যাতে সেই ঋণের ফলে দেশগুলো আমেরিকান কর্পোরেশনগুলোর নিয়ন্ত্রণে চলে আসে।

এই বইটি নিয়ে অবশ্য বিতর্কও আছে অনেক। কারণ কেউ কেউ এটিকে সত্যিকারের গোপনীয়তা প্রকাশ বলে মনে করেন, আবার কেউ এটিকে অতিরঞ্জিত বা ফিকশন বলে দাবি করেন। কিন্তু এর মাধ্যমে আধুনিক ইম্পেরিয়ালিজমের একটি ছবি উঠে আসে, সেটি অস্বীকারের কোন উপায় নেই। “ইকনোমিক হিট ম্যান” শব্দটি পার্কিন্সের মতো ব্যক্তির ভূমিকা বর্ণনা করতে ব্যবহৃত হয়, যাদের কাজ হলো উন্নয়নশীল দেশগুলোতে বিভিন্ন উন্নয়ন প্রকল্পের জন্য প্রয়োজনীয় আর্থিক অনুমান এবং উৎপাদনকারীদের ধ্বংসাত্মক প্রকল্প পরিকল্পনা বৈধ করার মাধ্যম খুঁজে বের করা। তারা বিশ্বব্যাংক, যুক্তরাষ্ট্রের ইউনাইটেড স্টেটস এজেন্সি ফর ইন্টারন্যাশনাল ডেভেলপমেন্ট (USAID) এবং অন্যান্য বিদেশী সহায়তা সংস্থাগুলির কাছ থেকে বিশাল অর্থ বিভিন্ন বড় বড় কর্পোরেশনের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদ বা রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট নিয়ন্ত্রণকারী কয়েকটি ধনী পরিবারের কাছে পৌঁছে দেয়। বিনিময়ে অর্থ প্রদানকারী দেশগুলোর ব্যবসা প্রতিষ্ঠানের পক্ষে সরকারী বড় ক্রয় অর্ডার, সশস্ত্র সংগঠনগুলোর কাছে অস্ত্র বিক্রির অবাধ বাণিজ্য পথ নিশ্চিত করা হয়। এইসব অনৈতিক সন্ধি আড়ালে রাখতে ভুক্তভোগী দেশগুলোতে প্রয়োগকৃত প্রধান কৌশলগুলোর মধ্যে আছে জালিয়াতিপূর্ণ আর্থিক প্রতিবেদন, কারচুপির নির্বাচন, চাঁদাবাজি, সেক্স এবং হত্যার অপরাধ। পার্কিন্সের বর্ণনায়, যদি EHM-রা ব্যর্থ হয়, তাহলে “জ্যাকাল” নামক গোপন এজেন্টরা নেমে পড়ে—যারা নেতাদের উৎখাত বা হত্যা করে।

গ্লোবাল নর্থের নির্ধারিত দেশগুলোর এই ধ্বংসাত্মক অর্থনৈতিক কৌশলের পিছনে উদ্দেশ্য হলো গ্লোবাল সাউথের দেশগুলিকে গভীর ঋণে নিমজ্জিত করা, নির্ভরতা এবং অভিজাতদের দুর্নীতির দিকে ডেকে আনা। পরবর্তিতে আন্তর্জাতিক বাণিজ্য ও আইনী সংস্থাগুলির মাধ্যমে গ্লোবাল সাউথের সব প্রাকৃতিক সম্পদ নিজেদের দাবি করা এবং গ্লোবাল নর্থে সম্পদ পাচারের উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা। এই ধ্বংসাত্মক ফলাফল অর্জনের লক্ষ্যে কর্পোরেশন, ব্যাংক, বৈদেশিক নীতি সংগঠন এবং আন্তর্জাতিক সরকারী ও বেসরকারী সংস্থাগুলির সমন্বয়ে একটি সুশৃঙ্খল ও শক্তিশালী অবকাঠামো তৈরি করা হয়। মূল কথা হলো, বিশ্বব্যাপী নর্থের অব্যাহত ধ্বংসাত্মক লাইফস্টাইলকে সমর্থন করার জন্য বিশ্ব প্রাকৃতিক সম্পদের আবাসস্থল গ্লোবাল সাউথ থেকে লুটপাটের মাধ্যমে সম্পদ অর্জন। এটি “প্রিডেটরি ক্যাপিটালিজম” নামক একটি রূপ, যা পার্কিন্সের মতে, স্বল্পমেয়াদী লাভের জন্য দীর্ঘমেয়াদী ধ্বংস ডেকে আনে।

ষোড়শ শতক থেকে একবিংশ শতাব্দী পর্যন্ত গ্লোবাল নর্থের শক্তিগুলো বিভিন্ন সময়ে গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোতে আক্রমণ করেছে, উপনিবেশ তৈরির মাধ্যমে হস্তক্ষেপ করেছে, প্রতারণা করেছে, ধ্বংস করেছে, কাট-অফ থেকে শুরু করে স্থানীয় জনগোষ্ঠীর বিরুদ্ধে একাধিক গণহত্যা করেছে। “আবিষ্কারের যুগে” (যেমন কলম্বাসের আমেরিকা আবিষ্কার, ১৪৯২) এবং “উপনিবেশিকরণের” সময় সম্পদ চুরি ও ছিনতাই কেবলমাত্র বৈষম্যীয় শ্রেষ্ঠত্ব এবং গ্লোবাল সাউথের বিপরীতে ইউরোপীয় কতৃত্ব প্রতিষ্ঠার জন্য ছিল না। আধুনিক উপনিবেশিক শৃঙ্খলা তৈরি করতে বিদ্যমান অর্থনীতি, বাজার এবং বাণিজ্য সম্পর্ককে নষ্ট করা হয়েছে।

১৯শ এবং ২০শ শতকের প্রথম দিকে গ্লোবাল নর্থের উন্নয়ন এবং অগ্রগতি গ্লোবাল সাউথে ধ্বংস, মৃত্যু এবং গণহত্যায় রূপ নিয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, আফ্রিকা মহাদেশের ধ্বংসের জন্য ফ্রেমিং ছিল “আফ্রিকার জন্য স্ক্র্যাম্বল”, যা আফ্রিকার বাণিজ্য ও উপনিবেশকরণের মধ্যে নিয়ন্ত্রণের জন্য ইউরোপীয় শক্তিগুলো ১৮৮৪-৮৫ সালের বার্লিন সম্মেলনে নিশ্চিত করে। প্রকৃতপক্ষে, ১৮৮১ থেকে ১৯১৪ সালের মধ্যে ইউরোপীয় শক্তি তথাকথিত “আফ্রিকার জন্য স্ক্র্যাম্বল” এর মাধ্যমে এই মহাদেশের ৯০ শতাংশ অঞ্চল নিজেদের দাবি করতে পেরেছিল। এই সম্মেলনটি আফ্রিকাকে ভাগ করে নেওয়ার একটি আনুষ্ঠানিক চুক্তি ছিল, যা স্থানীয় জনগণের ইচ্ছা উপেক্ষা করে কেবল ইউরোপীয় লাভের জন্য করা হয়।

রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে, এই কৌশলগুলো কোল্ড ওয়ারের (১৯৪৭-১৯৯১) সময়ে আরও তীব্র হয়। যুক্তরাষ্ট্রের CIA এবং অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলো EHM-দের সাথে সমন্বয় করে কাজ করত। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৫৩ সালে ইরানের প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ মোসাদ্দেককে উৎখাত করা হয়, কারণ তিনি ইরানের তেল শিল্পকে জাতীয়করণ করতে চেয়েছিলেন, যা ব্রিটিশ এবং আমেরিকান কর্পোরেশনগুলোর স্বার্থের বিরুদ্ধে ছিল। এই অভ্যুত্থানটি CIA-এর অপারেশন অজ্যাক্স নামে পরিচিত, যা Kermit Roosevelt Jr. দ্বারা নেতৃত্ব দেওয়া হয়।

একইভাবে, ১৯৭৩ সালে চিলির নির্বাচিত প্রেসিডেন্ট সালভাদোর আলেন্ডেকে উৎখাত করা হয়, যেখানে প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সনের নির্দেশে CIA “অর্থনীতিকে চিৎকার করতে” বাধ্য করে। আলেন্ডের সমাজতান্ত্রিক নীতি আমেরিকান কর্পোরেশনগুলোর (যেমন ITT এবং Anaconda Copper) স্বার্থের বিরুদ্ধে ছিল, ফলে অগাস্টো পিনোচেটের সামরিক অভ্যুত্থান ঘটে, যা হাজারো মানুষের মৃত্যু এবং অর্থনৈতিক ধ্বংস ডেকে আনে। পানামায়, প্রেসিডেন্ট ওমর তোরিজোস (মারা যান ১৯৮১ সালে বিমান দুর্ঘটনায়, যা পার্কিন্স দাবি করেন CIA-এর কাজ) পানামা ক্যানালের নিয়ন্ত্রণ ফিরিয়ে নিতে চেয়েছিলেন, যা আমেরিকান স্বার্থের বিরুদ্ধে ছিল।

ইকুয়েডরের প্রেসিডেন্ট জাইমে রোল্ডোসও তেল কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে একইভাবে মারা যান ১৯৮১ সালে। এই ঘটনাগুলো দেখায় যে, EHM-রা যদি ব্যর্থ হয়, তাহলে সামরিক বা গোয়েন্দা হস্তক্ষেপ ঘটে।এই উপনিবেশিক ব্যবস্থা সময়ের পরিক্রমায় আজকের আধুনিক রূপ নিয়েছে, যেখানে উপনিবেশ প্রতিষ্ঠায় শক্তির চেয়ে কৌশলের প্রয়োগ অনেক বেশি। আর এই কৌশল প্রয়োগের যে কৌশলী প্রধান কুশলীর ভূমিকায় আসেন তিনি হচ্ছেন “ইকনোমিক হিট ম্যান”! আধুনিক “স্বাধীন রাষ্ট্রগুলি” তাদের বাজারে নিরবচ্ছিন্ন প্রবেশাধিকার, গ্লোবাল নর্থে কাঁচামালের সংস্থান বজায় রাখতে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এবং সজ্জিত সামরিক বাহিনীকে ব্যবহার করার ব্যবস্থা গ্রহণ করেছে।

বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন অভ্যন্তরীণ বাধাগুলির ক্ষেত্রে, সামরিক বাহিনীর পদক্ষেপ নেওয়া এবং “আধুনিক” রাষ্ট্রীয় প্রকল্পটি নিরিবিচ্ছিন্ন রেখে গ্লোবাল নর্থের বিনিয়োগকে নিরাপদ রাখারই একটি কৌশলমাত্র। উপনিবেশিক দিনগুলিতে সেনাবাহিনী এবং প্রশাসকরা বিষয়টি তাদের নিজের হাতে নিয়েছিল, যেহেতু বর্তমান প্রেক্ষিত কিছুটা আলাদা, তাই প্রায়শই বিদেশী শক্তি দ্বারা প্রশিক্ষণ প্রাপ্ত সামরিক বাহিনী জাতিকে নিজের থেকে উদ্ধার করতে অভ্যুত্থান চালানোর জন্য ব্যবহৃত হয়। উদাহরণস্বরূপ, ১৯৮৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের পানামা আক্রমণ, যেখানে ম্যানুয়েল নোরিয়েগাকে উৎখাত করা হয়, কারণ তিনি আমেরিকান স্বার্থ মেনে চলেননি।

বিশ্বব্যাংক, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল (IMF) এর মতো বিশ্বব্যাপী আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলি শুল্ক ও বাণিজ্য সম্পর্কিত একটি সাধারণ চুক্তির (GATT) এবং ওয়ার্ল্ড ট্রেড অর্গানাইজেশন (WTO) পরিমণ্ডলের অর্থনীতিগুলিকে নিয়ন্ত্রণ করার জন্য কার্যকর করা হয়েছে। এই সংস্থাগুলো “স্ট্রাকচারাল অ্যাডজাস্টমেন্ট প্রোগ্রাম” (SAP) চাপিয়ে দেয়, যা ঋণের বিনিময়ে দেশগুলোকে বেসরকারিকরণ, বাজার উন্মুক্তকরণ এবং সামাজিক সেবা কাটছাঁট করতে বাধ্য করে, ফলে স্থানীয় অর্থনীতি ধ্বংস হয় এবং বিদেশী কর্পোরেশনগুলো লাভবান হয়। প্রকৃতপক্ষে, গ্লোবাল সাউথে বিদ্যমান উপনিবেশিক কাঠামোর দৃশ্যমান লক্ষণগুলি স্থানীয় অভিজাতদের উপস্থিতির মধ্য দিয়ে উজ্জ্বল হয়ে ওঠে। আধুনিক সময়ে, চীনও অনুরূপ কৌশল ব্যবহার করছে “বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ” (BRI) এর মাধ্যমে, যেখানে এশিয়া, আফ্রিকা এবং ল্যাটিন আমেরিকার দেশগুলোকে ঋণ দিয়ে অবকাঠামো নির্মাণ করে, কিন্তু ঋণ পরিশোধ না হলে সম্পদ দখল করে নেয়—যেমন শ্রীলঙ্কার হাম্বানটোটা বন্দর।

এই “ইকনোমিক হিট ম্যান” প্রকৃতপক্ষে বহুজাতিক সংস্থা, বিশ্বব্যাংক এবং IMF-এ অন্তর্ভুক্ত রয়েছে যারা গ্লোবাল সাউথের ব্যয়ে গ্লোবাল নর্থ অর্থনীতির স্বার্থ রক্ষার জন্য কাজ করে যাচ্ছে। ফলস্বরূপ, স্থানীয় সাউথ অর্থনীতিগুলি কখনই স্থানীয় উৎপাদন ব্যয়ের মাধ্যমে প্রাকৃতিক সম্পদের প্রবাহ বজায় রাখতে এবং ইউরোপীয় ও মার্কিন অর্থনীতির উপর নির্ভরশীলতা থেকে বের হয়ে আসতে সক্ষম হয়নি। দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার অংশ হিসেবে “ইকনোমিক হিট ম্যান”রা গ্লোবাল সাউথকে গ্লোবাল নর্থে একটি সেবা, কাঁচামাল এবং সস্তা শ্রম সরবরাহকারী হিসাবে প্রতিষ্ঠার পাশাপাশি এই দেশগুলির ঋণ বাড়ানো এবং তাদের রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা গ্রহণের জন্য একটি উৎস হিসাবে ব্যবহার করা। বস্তুত, গ্লোবাল নর্থের অংশগ্রহণ বা জড়িত হয়ে গ্লোবাল সাউথের উন্নয়ন বা প্রকল্প ধারণাটি অক্সিমোরোনিক এবং অর্থনৈতিক পরিকল্পনার সব দিকেই একটি বৈপরীত্য গঠন করে।

“ইকনোমিক হিট ম্যান” এর প্রভাব থেকে বের হয়ে আসতে হলে গ্লোবাল সাউথের অর্থনীতিগুলোকে অবশ্যই তাদের উদীয়মান ক্ষতিকারক আর্থিক সরঞ্জাম এবং সরঞ্জামগুলি থেকে উদ্ভূত পরিস্থিতি থেকে নিজেদের সম্পদ সুরক্ষিত করার উপায়গুলি খুঁজতে হবে। সত্যিকারের এবং টেকসই স্বাধীনতার রাস্তাটি এমন অর্থনৈতিক মডেলগুলির পক্ষে প্রচুর পরিমাণে নির্ভরশীল যা গ্লোবাল নর্থ অর্থনীতির অধীন নয় বা আন্তর্জাতিক ঋণ অর্থায়নে জড়িত নয়। উদাহরণস্বরূপ, বলিভিয়ার প্রেসিডেন্ট ইভো মোরালেস (২০০৬-২০১৯) প্রাকৃতিক সম্পদ জাতীয়করণ করে এবং IMF-এর চাপ প্রত্যাখ্যান করে দেশের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছিলেন, যদিও তিনি চাপের মুখে পড়েছিলেন।

গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে স্থানীয় উন্নয়ন মডেল, দক্ষিণ-দক্ষিণ সহযোগিতা (যেমন BRICS) এবং টেকসই অর্থনীতির দিকে যেতে হবে, যাতে ঐতিহাসিক লুটপাটের চক্র ভাঙা যায়। এটি কেবল অর্থনৈতিক নয়, রাজনৈতিক স্বাধীনতারও লড়াই। এর জন্য প্রয়োজন স্বাধীন আর্থিক কাঠামো, স্থানীয় সম্পদের সুরক্ষা এবং বৈদেশিক ঋণের উপর নির্ভরতা কমানো। কিছু কৌশল হতে পারে:

  • স্থানীয় উৎপাদন ও ক্ষুদ্র উদ্যোগে বিনিয়োগ: কৃষি, খাদ্য ও স্থানীয় শিল্পকে শক্তিশালী করে দেশগুলো স্বাবলম্বী হতে পারে।
  • স্বাধীন আর্থিক নীতি ও ঋণ মুক্ত পরিকল্পনা: আন্তর্জাতিক দেনা কমানো এবং স্থানীয় তহবিল ও বিনিয়োগ ব্যবস্থাকে শক্তিশালী করা।
  • প্রাকৃতিক সম্পদের ন্যায্য ব্যবহার ও পরিবেশ সংরক্ষণ: দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ও সামাজিক স্থিতিশীলতার জন্য।
  • শিক্ষা ও মানবসম্পদ উন্নয়ন: জনগণের দক্ষতা বৃদ্ধি, কর্মসংস্থান ও মানবিক উন্নয়নে বিনিয়োগ।

সার্বিকভাবে, ইকনোমিক হিট ম্যান শুধুমাত্র একটি অর্থনৈতিক কৌশল নয়, এটি একটি আধুনিক উপনিবেশিক প্রক্রিয়ার প্রতীক, যা দেশের অর্থনীতি, সামাজিক কাঠামো এবং মানবিক উন্নয়নের উপর ব্যাপক প্রভাব ফেলে। গ্লোবাল সাউথের দেশগুলোকে সত্যিকারের স্বাধীনতা অর্জন করতে হলে তাদের স্থানীয় সম্পদ, অর্থনীতি ও সামাজিক কাঠামো রক্ষা করার জন্য সক্রিয়ভাবে টেকসই কৌশল গ্রহণ করতে হবে, যা গ্লোবাল নর্থের স্বার্থের চাপে নয়।

Unknown's avatar

About Md. Moulude Hossain

Digital Transformation Leader | FinTech & Digital Payments Strategist | Product Management | Business Case Architect

Discussion

6 thoughts on ““ইকনোমিক হিট ম্যান” — অর্থনীতির আড়ালে লুকিয়ে থাকা সাম্রাজ্যবাদী ক্ষমতার কারিগর

  1. Sadrul Islam's avatar

    The development project funding from developed economy is always been a trap set by these Hitman. Getting out of this trap is the path toward real independence and indigenous modes of development that can uplift society. At the core, a strategic decision must be made on the foundation, future horizon and the quality of life that is desired for society.

    Posted by Sadrul Islam | November 29, 2019, 7:53 pm
  2. Nawmeen Khan Ayat's avatar

    সময়ের বিবর্তনে বিশ্বের নতুন নতুন অর্থনৈতিক ও বাণিজ্যিক পরাশক্তির উদ্ভবের কারণে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পাশাপাশি চীন, ভারতের মতো দেশগুলোও এখন এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোতে ইকোনমিক হিটম্যান নিয়োগ করছে কিনা আমার তা জানা নেই। তবে বিশ্বরাজনীতি ও আন্তর্জাতিক সম্পর্কের প্রায় সবকিছুই এখন বাণিজ্য এবং আগামীদিনের রাজনৈতিক-অর্থনৈতিক নিরাপত্তার কৌশলগত দিক বিবেচনা করেই নির্ধারিত হচ্ছে।

    Posted by Nawmeen Khan Ayat | December 10, 2019, 2:59 pm
  3. Mahbub Rahman Tomal's avatar

    অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের জন্য বিশ্বব্যাপী ইকোনমিক হিটম্যানদের ভূমিকা অপরিহার্য। কনফেশান অব ইকোনমিক হিটম্যানের লেখক জন পারকিনসের একটি ভালোলাগা উদ্ধৃতির উল্লেখ করতে চাই, “No constitution, no court, no law can save liberty when it dies in the hearts and minds of men. – John Perkins ” অর্থাৎ- মানুষের চেতনা ও মনোজগতে লিবার্টি বা স্বাধীনতার আকাক্সক্ষা মরে গেলে, কোনো সংবিধান, কোনো আদালত বা কোনো আইনই তার স্বাধীনতা রক্ষা করতে পারে না।

    Posted by Mahbub Rahman Tomal | January 23, 2020, 4:05 pm
  4. Sabbir Rahman's avatar

    These economic hitman raised huge loans for the developing countries, but the money never actually went to the countries, it went to the Hitman country’s own corporations to build infrastructure in those countries. And when the countries could not pay off their debt, this Hitman insisted that the country privatize their water systems, their sewage systems, their electric systems. And ofcourse the MPs/Ministers get their part and sell the country interest….

    Posted by Sabbir Rahman | February 29, 2020, 6:16 pm
    • Maksudur Rahman's avatar

      হিটম্যানরাই কিন্তু শেষ কথানা, কোনো দেশে হিটম্যানেরা ব্যর্থ হলে লক্ষ্য অর্জনে ওই দেশে পূর্ব থেকে প্রস্তুতকৃত জ্যাকলরা এগিয়ে আসেন। দ্বিতীয় লাইনে থাকা জ্যাকলরা ব্যর্থ হলে সংশ্লিষ্ট দেশের সেনাবাহিনীকে ব্যবহারের চেষ্টা করা হয়। আর এগুলো কিছু কাজ না করলে সরাসরি সামরিক অভিযানে নামতে পারে যুক্তরাষ্ট্র। জন পার্কিনস তার বইতে বলেছেন, সাদ্দাম হোসেনকে উত্খাত ও ইরাক দখলের সব বিকল্প ব্যর্থ হওয়ায় সর্বশেষ পন্থা হিসেবে সামরিক অভিযান চালায় যুক্তরাষ্ট্র। হিটম্যানদের কায়দায় পরিকল্পিতভাবে জ্যাকলদেরকে তৈরি করা হয় না।

      Posted by Maksudur Rahman | June 6, 2020, 8:24 pm
  5. Touhid Saifullah's avatar

    বিশ্বব্যাংক, আইএমএফ, জাতিসংঘের বিভিন্ন সংস্থা, যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের সাহায্যকারী সংস্থা, মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে এদেরকে নিয়োগ দেওয়া হয় অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে ছদ্মনাম ও ছদ্মবেশে। নিজ নিজ সংস্থা থেকে কোন দেশে কোন সেক্টরে কী পরিমাণ ঋণ দেওয়া হবে এবং তাতে কী কী শর্ত থাকবে এ ধরনের নীতিনির্ধারণী অবস্থানে কাজ করে হিটম্যানেরা। নির্দিষ্ট টার্গেটেড দেশের শাসন ও ক্ষমতাবানদের বুঝিয়ে বহুমুখী প্রলোভনের ফাঁদে ফেলে বিশাল অঙ্কের বৈদেশিক ঋণ গ্রহণে সম্মত করানো এদের অন্যতম একটি কাজ।

    Posted by Touhid Saifullah | March 19, 2020, 8:20 pm

Leave a reply to Maksudur Rahman Cancel reply

Eduva IELTS

Blog Stats

  • 122,720 hits

Archives

upay bonus

Recent Post