
সময় যেন এক মহাজাগতিক ইশারা। মানুষের জীবনের সবকিছুই সময়ের স্রোতে আবদ্ধ, কিন্তু সময়কে কখনো ইচ্ছের ফ্রেমে বন্দি করা যায় না। তবে মানুষের জন্য সময়ের সবচেয়ে বড় উপহার হচ্ছে স্মৃতির মায়াবী দুনিয়া। এই তো সেদিন তোমার তৃতীয় জন্মদিনে তোমার বেড়ে ওঠা নিয়ে কিছু কথা লিখেছিলাম। আরও একটি বছর পেরিয়ে আজ তুমি চার বছরে পদার্পণ করলে। বাবা হিসেবে যতই সময় যাচ্ছে, প্রতিটি বছরই তুমি আমাকে নতুন কোনো শিক্ষা দিচ্ছ, আমাকে নতুন করে মানুষ হিসেবে গড়তে সাহায্য করছ। আমার অনুভূতিগুলো এক অদ্ভুত প্রতিলিপিতে রূপান্তরিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। নিজের ভিতর প্রতিনিয়ত আবিষ্কার করছি নতুন এক মানুষের অস্তিত্বকে। চলো এবারও একটা গল্প দিয়ে শুরু করি।
এক বিশাল পাহাড়ের দুই চূড়ার মাঝে একটি সরু রশি টাঙানো রয়েছে। নিচে হাজার ফুট গভীর খাদ। একজন সার্কাস জাদুকর সেই রশির ওপর দিয়ে অনায়াসেই হেঁটে এক পাহাড় থেকে অন্য পাহাড়ে যাচ্ছেন। সেটি দেখে পাহাড়ের নিচে দাঁড়িয়ে শত শত মানুষ হাততালি দিচ্ছে। জাদুকর এবার একটি এক চাকার ঠেলাগাড়ি (Wheelbarrow) নিয়ে রশির ওপর দিয়ে হেঁটে ওপাড়ে গেলেন এবং ফিরে এলেন। দর্শকদের মুগ্ধতা এবার বাঁধভাঙ্গা, করোতালিতে মুখর! জাদুকর এবার ভিড়ের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “আপনাদের কি মনে হয় আমি এই ঠেলাগাড়িতে একজন মানুষকে বসিয়েও রশির ওপাড়ে নিয়ে যেতে পারব?” সবাই সমস্বরে চিৎকার করে উঠল, “হ্যাঁ, আমরা বিশ্বাস করি (Believe) আপনি পারবেন!” জাদুকর তখন মুচকি হেসে দর্শকদের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলেন, “বেশ, তাহলে আপনাদের মধ্যে কে এই গাড়িতে বসতে রাজি আছেন? আমি তাকে ওপাড়ে নিয়ে যাব।” মুহূর্তেই সেই উৎসাহী ভিড় নিস্তব্ধ হয়ে গেল। যে মানুষগুলো একটু আগে জোরে চিৎকার করে বলেছিল ‘আমরা বিশ্বাস করি’, সেই মানুষগুলোকে এবার ভয় আর সংশয় গ্রাস করল।
বাবা নির্ভেদ, এই গল্পে জাদুকরের সামর্থ্যের ওপর দর্শকদের সেই হাততালি ছিল ‘বিলিভ’ বা বিশ্বাস। তারা দূর থেকে দেখেছে জাদুকর দক্ষ, তাই বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে তারা মেনে নিয়েছিল যে তিনি পারবেন। কিন্তু যখনই নিজেকে সেই গাড়িতে সঁপে দেওয়ার প্রশ্ন এল, তখনই তাদের বিশ্বাসের সীমাবদ্ধতা ধরা পড়ল। জাদুকরের সামর্থ্যের ওপর তাদের ‘বিলিভ’ বা বিশ্বাস আছে কিন্তু যেটা নেই সেটা হলো ‘ফেইথ’ বা আস্থা! ‘বিলিভ’ থাকে মস্তিষ্কে, কিন্তু ‘ফেইথ’ থাকে হৃদয়ে। ফেইথ মানে হলো অনিশ্চয়তার মুখেও নিজেকে সম্পূর্ণভাবে সঁপে দেওয়া।
আরেকটু ব্যাখ্যা করার লোভ সামলাতে পারছি না বাবা! আসলে ‘বিলিভ’ বা বিশ্বাস হলো অনেকটা বুদ্ধিবৃত্তিক। আমরা যখন দেখি আকাশ মেঘলা, তখন আমরা ‘বিশ্বাস’ করি বৃষ্টি হবে। এটি তথ্যের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠে। তুমি যখন বইয়ে পড় বা আমরা তোমাকে বলি যে আগুনে হাত দিলে পুড়বে, তখন তুমি তা ‘বিলিভ’ করো। অন্যদিকে, ‘ফেইথ’ বা আস্থা হলো হৃদয়ের গভীর থেকে আসা এক অটল প্রতীতি। এটি তথ্যের সীমানা ছাড়িয়ে অজানার দিকে ডানা মেলা। ফেইথ হলো সেই শক্তি যা মানুষকে অন্ধকার সুড়ঙ্গের শেষেও আলো দেখতে সাহায্য করে। তুমি যখন আমার হাত ধরে রাস্তা পার হও, তুমি তখন এটা বিচার করো না যে আমি তোমাকে রক্ষা করতে পারব কি না – আর এটাই হলো তোমার আমার ওপর ‘ফেইথ’।
বাবা, চার বছরের এই ছোট্ট বয়সে হয়তো এই শব্দগুলোর গূঢ় অর্থ তোমার কাছে এখনও ধরা দেবে না, কিন্তু একজন বাবা হিসেবে আমি তোমার জীবনের ভিত্তিটা এই পার্থক্য দিয়েই গড়তে চাই। তুমি যখন বড় হবে, আমি চাই ‘বিশ্বাস’ করতে শেখার পাশাপাশি তোমার হৃদয়ে যেন ‘আস্থা’ থাকে। বড় হয়ে কেবল দৃশ্যমান তথ্যে ‘বিলিভ’ না করে, বরং অদৃশ্য সেই পরম করুণাময় এবং নিজের সামর্থ্যের ওপর যেন অটল ‘ফেইথ’ বা আস্থা রাখতে শেখো। কারণ, বিশ্বাস কখনো কখনো যুক্তির কাছে হার মানতে পারে, কিন্তু সত্যিকারের ‘আস্থা’ মানুষকে হিমালয় জয়ের শক্তি জোগায়।
তোমার চতুর্থ জন্মদিন এসেছে একটা অদ্ভুত সময়ে। পৃথিবী এখনও তার পুরনো ক্ষত থেকে সেরে উঠছে – মহামারী, অনিশ্চয়তা, মানুষের মধ্যে দূরত্ব। কিন্তু তুমি? তুমি এই সবের মাঝে ফুটে উঠেছ যেন একটা ছোট্ট ফুল। তিন বছরে তুমি কথা বলতে শিখেছিলে, যুক্তি দিতে শুরু করেছিলে। আর এই চতুর্থ বছরে? তুমি এখন গল্প বলো, প্রশ্ন করো, “কেন?” বলে আমাকে অবাক করো। তোমার কথায় এখন আরও স্পষ্টতা, আরও জীবন। তোমার মা বলে, “দেখো, নির্ভেদ এখন কতটা স্বাধীন হয়ে উঠেছে!” আর আমি? আমি তোমার এই বেড়ে ওঠা দেখে প্রতিদিন নতুন করে জন্ম নিই।
তুমি বিশ্বাস করবে যে তোমার স্বপ্নগুলো সত্যি হবে, যদিও পথটা অন্ধকার। ফেইথ তোমাকে শক্তি দেবে যখন বিলিভ দুর্বল হয়ে পড়বে। জীবনে দুটোকেই লাগবে – বিলিভ তোমাকে বাস্তববাদী করবে আর ফেইথ করবে সাহসী। কিন্তু সতর্ক থেকো, নির্ভেদ! বিলিভকে ফেইথের সাথে মিশিয়ে ফেলো না, না হলে বিভ্রান্তি আসবে। প্রমাণ ছাড়া ফেইথ রাখো আল্লাহর ওপর, নিজের ওপর এবং তোমার পরিবারের ওপর।
নির্ভেদ, তুমি এক বিস্ময়কর জগতে বাস করছ। তোমার কৌতূহলী চোখ, অজানাকে জানার তীব্র ইচ্ছা আর ছোট্ট পায়ে বড় বড় পদক্ষেপগুলো আমাকে প্রতিনিয়ত মুগ্ধ করে। চার বছর বয়সে তোমার ব্যক্তিত্বের যে বিকাশ আমি দেখছি, তা একাধারে বিস্ময়ের এবং আনন্দের। তুমি এখন শুধু আমার ছেলে নও, আমার একজন সহযাত্রী। তোমার প্রতিটি হাসি যেন আমার হৃদয়ে ফেইথ-এর বীজ বুনে দেয় যে – আগামীকাল অবশ্যই আজকের চেয়ে সুন্দর হবে। পৃথিবীর চাতুর্যকে পিছনে ফেলে, তুমি যেন শব্দের ডানায় উড়ে যাও – যেখানে বিলিভ আর ফেইথ মিলে একটা নতুন আকাশ তৈরি করে।
পরিশেষে একটি কথা বলে শেষ করছি। সন্তানের প্রয়োজনে বাবা-মা পাশে দাঁড়াবে এটি একটি বিলিভ বা বিশ্বাস। কিন্তু আমি চাই আমাদের (তোমার বাবা এবং মা) সাথে তোমার সম্পর্ক এবং বোঝাপড়ার বুনিয়াদটা যেন শুধু এই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করে না হয়। কারণ সময় এবং পরিস্থিতির কারণে অনেক সময় অনুভূতিগুলো ডানা মেলতে পারে না। অনেক কথা মনেই থেকে যায়, বলা হয়ে ওঠে না। মানুষ হিসেবে আমরাও এর ঊর্ধ্বে নই। আমাদের সাথে তোমার বন্ধনটা হোক আস্থার। বাবা এবং মা তোমার ভালো চায়, তোমার প্রয়োজনে পাশে দাঁড়াবে – এই আস্থাটুকু রেখো। আমি প্রার্থনা করি, তোমার জীবন এবং আমাদের সাথে তোমার সম্পর্কের সমীকরণ যেন এই পার্থক্য দিয়ে সমৃদ্ধ হয়। তুমি যেন বিলিভ করো সত্যে, আর ফেইথ রাখো ভালোবাসায়। বিলিভ/বিশ্বাস করো যা দেখো, কিন্তু ফেইথ/আস্থা রাখো যা অনুভব করো।
শুভ জন্মদিন, আমার ছোট্ট যোদ্ধা প্রিয় নির্ভেদ। তোমার এই চার বছরের যাত্রা যেমন আমাদের জীবনকে বর্ণিল করেছে, তেমনি তোমার আগামীর পথচলা হোক অর্থময়। তোমার হৃদয়ে যেন সততার প্রতি ‘বিলিভ’ থাকে এবং সত্যের জয়ের প্রতি অটল ‘ফেইথ’ থাকে। তোমার এই চার বছরের যাত্রা আমার জীবনের সবচেয়ে মূল্যবান অধ্যায়।
ভালো থেকো বাবা, তোমার প্রতিটি নিঃশ্বাসে মিশে থাকুক এক বাবার অন্তহীন ভালোবাসা এবং অটুট দোয়া।


Discussion
No comments yet.