
২০১৬ সালের সেই রাত্রি ছিল যেন এক অন্ধকার কবিতার শেষ ছত্র। মারাকানার আলো ম্লান হয়ে এসেছিল। চিলির গোলপোস্টে মেসির পেনাল্টি ফিরে এসেছিল আর্জেন্টিনার হারের প্রতিধ্বনিতে। খেলা শেষে সেই অধরা অর্জনের আক্ষেপ নিয়ে দাঁড়িয়ে থাকা লিওনেল মেসির চোখ থেকে ঝরে পড়ছিল অশ্রু। মেসির সেই কান্নার ছবি কারো কাছে ছিল হৃদয়ের রক্তক্ষরণ, আবার কারো কাছে ছিল তার ফুটবলীয় কিংবদন্তি অস্বীকার করা ট্রলের উপাদান। হতাশা আর অভিমানে সেদিন মেসি ঘোষণা করেছিলেন, “জাতীয় দলের হয়ে আর নয়।” ২০১৬ সালের সেই সময়ে মেসিকে নিয়ে আমি লিখেছিলাম – এক অসমাপ্ত রূপকথার পরাজিত মহানায়ক। কিন্তু গল্পটা ছিল অনেকটা কবিতার মতো, যা কখনো শেষ হয় না। কবিতায় বলতে চাওয়া ভাবটা কিছুক্ষণের জন্য নীরব হয়, যাতে নীরবতা ভেঙে পরের অধ্যায়ে আরও গভীর সুরে ফিরে আসতে পারে।
বার্সেলোনার হয়ে মাঠের অতিমানব মেসি হার মানলেন এক অমোঘ বাস্তবতার কাছে। তার সেই ছোট ঘোষণায় ছিল শুধু ক্লান্তি, হতাশা আর এক মানুষের আত্মার আঘাত। আমরা ভেবেছিলাম, লিখেছিলাম কিংবদন্তির ইতিকথা। কিন্তু মেসির গল্প থেমে থাকেনি; মেসি পালায়নি, সে হাল ছাড়েনি। মেসির সেই একাকী দাঁড়িয়ে থাকা, সেই স্থির চাহনি, সেই নীরব দৃঢ়তা আমাকে আঘাত করেছে বারংবার। তার সেই মৌনতা আমার ভেতরে ঢুকে পড়েছিল, যেভাবে একটি শান্ত গভীর নদীর ধারা মাটি খুঁড়ে প্রবাহিত হয় – যার প্রতিটি ঢেউ হৃদয়ের তলে দোল খায়। মেসির অভিমানের সেই কালো মেঘের আড়ালে লুকিয়ে ছিল সূর্য। মেসি ঠিকই ফিরলেন – না শব্দে, না ঘোষণায়। ফিরে এলেন পায়ের ছোঁয়ায়, চোখের দৃঢ়তায়, হৃদয়ের অদম্য আগুনে। যেন এক ফিনিক্স, যে ছাইয়ের মাঝ থেকে নতুন ডানা মেলে আকাশ ছুঁয়ে উড়ে যায় – আরও উঁচুতে, আরও নীলে।
কিছু মানুষ আসে জীবনে, তাদের আমরা দেখি না; আমরা শুধু অনুভব করি। তাদের আসাটা ধীর, নীরব, নদীর জলের মত – শীতল, অদৃশ্য অথচ সবকিছুকে অদম্যভাবে ভাসিয়ে নিয়ে যায়। মেসি আমার জীবনে ঠিক এমন একজন। এখন আমি যখন মেসিকে দেখি, আমি তার ফুটবলীয় কৌশল দেখি না – একাধিক ডিফেন্ডারকে কাটিয়ে, গোলকিপারকে ফাঁকি দিয়ে গোল দেখি না। মেসি এখন আমার কাছে একজন ফুটবলারের চেয়েও বেশি কিছু। আমি মেসিকে দেখি চুপচাপ সহ্য করতে, নিঃসঙ্গতার অন্ধকারে দাঁড়িয়ে থাকতে, ধীর নীরবতা এবং এক অদৃশ্য শক্তি ধারণ করতে। যেন একটি ছোট নৌকা বড় সমুদ্রের ঢেউয়ের সঙ্গে হারিয়ে যাচ্ছে, তবুও অটল থেকে যাচ্ছে। সে আমার অনেক চিন্তা এবং চেতনাকে নাড়া দিয়েছে, তাই এখন মেসিকে নিয়ে বলা গল্প আর মেসির সঙ্গে আমার ছেলেকে পরিচয় করিয়ে দেওয়াটা অনেকটা দায়িত্বের আঙ্গিকে চলমান।
আসলে মেসি এখন আমার কাছে কোনো চরিত্র নয়, সে একটা অনুভূতি – যার শুরু চোখে দেখা দিয়ে হয়নি, শেষও কোনো ট্রফির ঝলকানিতে নয়। তার ছোট্ট শরীরের ভেতর যত্নে লালন করা এক দেশের স্বপ্ন, তার চোখে নিজেকে প্রমাণ করার এক অনন্ত তাগিদ, যেন নদীর গভীর পানির নীরব প্রবাহ।
মেসির আসল যাত্রা কখনো গোলের হিসাব বা ট্রফির সংখ্যায় মাপা যাবে না। প্রতিটি পদক্ষেপ, প্রতিটি নিঃশ্বাস, প্রতিটি দৃষ্টিবিন্দু ছিল নেতৃত্বের নিখুঁত প্রকাশ। নদী যেমন জানে কখন তীরে ধাক্কা দিতে হবে আর কখন নিঃশব্দে বয়ে যেতে হবে, মেসিও তেমনই জানত। মাঠে সে কাউকে বলত না, “আমাকে অনুসরণ করো।” সে বলত, “আমি আছি, চলো।” আর আমি এবং আমরা শিখতাম তার নীরব নেতৃত্ব – নেতৃত্ব মানে সামনে দাঁড়িয়ে চিৎকার করা নয়; নেতৃত্ব মানে ভারী বোঝা নিজের কাঁধে তুলে নেওয়া, ব্যথাকে গোপনে বহন করা, আর শেষ পর্যন্ত থাকা।

এখনো মনে আছে ২০১৭ সালের সেই রাত, যখন বিশ্বকাপের দরজাটা বন্ধ হওয়ার দ্বারপ্রান্তে আর আর্জেন্টিনার নিঃশ্বাস আটকে আছে একটি ম্যাচে। ২০১৮ বিশ্বকাপে স্থান নিশ্চিত করতে হলে আর্জেন্টিনাকে জিততেই হবে – এমন একটি সমীকরণের সামনে দাঁড়িয়ে মেসি জাতীয় দলের জার্সিতে ফিরলেন। কিন্তু মাঠে নেমে প্রথমেই গোল হজম করল আর্জেন্টিনা। চারপাশে অন্ধকার নেমে এলো, বুকের ভেতর ভাঙনের শব্দ। তখন কোনো ভাষা ছিল না, কোনো নাটক ছিল না, শুধু মনের ভেতর এক চাপা কান্না। কিন্তু মেসির মতো কিংবদন্তিদের, নেতাদের জীবনের চিত্রনাট্য সৃষ্টিকর্তা নিজেই লেখেন। আর্জেন্টিনার মানচিত্রে এবং ফুটবল ইতিহাসেও এর ব্যতিক্রম হয়নি। মেসি বলের কাছে গেল – এক গোল, তারপর আরেকটা, তারপর তৃতীয়টা – হ্যাটট্রিক। সেদিন মেসির গোলগুলো শুধু গোল ছিল না; সেগুলো ছিল বেঁচে থাকার আকুতি, একটি দেশের নিঃশ্বাস নেওয়ার অধিকার। সেই রাতে মেসি ফুটবল খেলতে নামেনি, সে দায়িত্ব নিয়েছিল। নদী যেমন বাঁধ ভাঙে না কিন্তু পথ বদলে দেয়, মেসিও ঠিক তেমনই। লা মাসিয়ার সেই ঐতিহাসিক “আনকারা মেসি” নিশ্চিত করলেন আর্জেন্টিনার ২০১৮ বিশ্বকাপ যাত্রা।
কিন্তু মেসির চিত্রনাট্য তখনও অসমাপ্ত। ২০১৮ সালে বিশ্বকাপের দ্বিতীয় পর্বে ফ্রান্সের কাছে পরাজিত হয়ে সেই বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নেয় আর্জেন্টিনা। এমবাপ্পে, গ্রিজম্যান, বেনজেমা সহ ফ্রান্সের খেলোয়াড়রা যখন উন্মাদনায় ব্যস্ত, মেসি তখন কোমরে হাত দিয়ে মাঠে দাঁড়িয়ে ছিলেন কালের সাক্ষী হয়ে। কয়েক হাজার মানুষে ভর্তি সেই স্টেডিয়ামে মেসিকে ঘিরে ছিল করুণ একাকীত্ব, একরাশ শূন্যতা আর অসম্ভব বেদনার নীরবতা। সে ম্যাচের ধারাভাষ্যকারের কণ্ঠেও ছিল রক্তক্ষরণ। গ্যারি ক্যানিং সেদিন যাই বলছিলেন, তার কণ্ঠে ছিল শূন্যতা। তিনি থেমে থেমে বলছিলেন—“সম্ভবত এটাই মেসির শেষ বিশ্বকাপ ম্যাচ।” এই কথা খুবই প্রাসঙ্গিক ছিল। কারণ পরের বিশ্বকাপ (২০২২)-এ মেসির বয়স হবে ৩৫। তবে সেটি ঘোষণা বা উপসংহার যাই হোক না কেন, তা ছিল সময়ের এক নিষ্ঠুর তাড়াহুড়া। কিন্তু মেসি কখনো তাড়াহুড়া করে না।
এখানে মেসির একটি ঘটনা বলতে চাই। ঘটনাটির প্রেক্ষাপট হচ্ছে ২০১৪ সালের বিশ্বকাপ ফাইনালে জার্মানির বিপক্ষে আর্জেন্টিনার হার। সে ম্যাচে আর্জেন্টিনার স্ট্রাইকার হিগুয়েন একাধিক সহজ গোলের সুযোগ নষ্ট করেন। সেই হারের জন্য সমর্থকরা আজও হিগুয়েনকে দায়ী করেন। শুধু তাই নয়, জার্মানির কাছে ১–০ গোলে হারের পর হিগুয়েন নিজের মিস করা সুযোগের জন্য ভীষণ অপরাধবোধে ভুগছিলেন। ড্রেসিং রুমে সবাই ছিল নীরব এবং তার ওপর রাগান্বিত। তবে মেসি সেদিন একজন সত্যিকারের নেতার মতো এগিয়ে এসে হিগুয়েনকে আগলে রাখেন এবং দল হিসেবে ফাইনাল পর্যন্ত আসায় গর্ব প্রকাশ করেন। হারের পর ভেঙে পড়া গঞ্জালো হিগুয়েনকে ড্রেসিং রুমে জড়িয়ে ধরে লিওনেল মেসি সান্ত্বনা দিয়ে বলেছিলেন, “সব ঠিক আছে। এটাই ফুটবল। আমরা ফাইনাল পর্যন্ত এসেছি, আমরা চ্যাম্পিয়ন।” একটি আলাপচারিতায় পরবর্তীতে হিগুয়েন জানান, মেসি না থাকলে তিনি সেই হারের পর আরও বেশি ভেঙে পড়তেন এবং এই মহানুভবতার কারণেই তিনি পরবর্তীতে দল থেকে বাদ পড়া থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন।

শুধু নিজের সতীর্থ নন, তার প্রতিদ্বন্দ্বীরাও এটা বুঝত। মাঠে তারা তাকে ফাউল করত, আটকাত, ভয় পেত—কিন্তু ম্যাচ শেষে চোখে চোখ রেখে সম্মান জানাত। কারণ তারা জানত, তারা একজন খেলোয়াড়ের বিপক্ষে খেলছে না, তারা খেলছে এক সময়ের বিপক্ষে। রোনাল্ডো (ব্রাজিল) বলেছিলেন, মেসি খেলাটাকে সহজ দেখায় কারণ সে খেলাটাকে ভেতর থেকে বোঝে। রোনালদিনহো বলেছিলেন, মেসির মতো আর কেউ হবে না। রবার্তো কার্লোস বলেছিলেন, সে ভবিষ্যৎ এক সেকেন্ড আগে দেখে ফেলে। ফিগো বলেছিলেন, সে ধারাবাহিক বিস্ময়। জিদান বলেছিলেন, মেসিকে দেখলে ফুটবল শিল্প হয়ে যায়। এগুলো প্রশংসা নয়, এগুলো ছিল স্বীকারোক্তি।
২০২১ সালে ব্রাজিলের মারাকানা আবার জেগে উঠল – এবার হারের জন্য নয়, জয়ের জন্য। অ্যাঞ্জেল ডি মারিয়ার পায়ে বল যখন জালে ঢুকল, তখন মনে হলো সময় থেমে গেছে। ট্রফিটিতে মেসির চুমুতে মিশে ছিল ২৮ বছরের অপেক্ষা, সব হারের কান্না, সব ফাইনালের অশ্রু। সেই রাতে আর্জেন্টিনার রাস্তায় আগুন জ্বলে উঠল। মেসির চোখে প্রথমবার দেখা গেল শান্তি। মেসির আকাশে জন্ম নিল নতুন একটি তারা – যার নাম ছিল কোপা আমেরিকা।
কোপা আমেরিকা ২০২১ কোনো ট্রফি ছিল না, ছিল এক দীর্ঘশ্বাস। অপূর্ণতাকে আলিঙ্গন করার সাহস, ব্যর্থতাকে শক্তিতে রূপান্তর করার শিক্ষা, অধ্যবসায়কে জীবনের রক্তে মিশিয়ে নেওয়ার মুহূর্ত। মেসির সেই ট্রফি জয়ে কোনো অহংকার ছিল না, ছিল না কোনো হিংস্র চিৎকার। সেই ট্রফিতে মেসির স্পর্শ ছিল এক অমোঘ প্রাপ্তির – ছিল শান্ত, নিখুঁত, ছিল ভিডিও কলে পূর্ণতার উদযাপন। সেদিনের মেসিকে মনে হচ্ছিল, সে যেন তার জীবননদীর তীরে দাঁড়িয়ে সূর্যাস্তের আলোয় নিজের দীর্ঘ যাত্রার দিকে তাকিয়ে আছে। নীলা-আকাশি জার্সিতে মেসির উন্মাদনার মূল্য সেই বুঝবে, যে আগের ১৫ বছর মেসির গল্পটা জানে।
মেসির না পাওয়ার গল্পটা যেমন দীর্ঘ কান্নার কবিতা, মেসির সর্বজয়ী হওয়াটাও তেমনই কালজয়ী। যেখানে সবাই মেসির প্রতি ফুটবল জাস্টিস/ইনজাস্টিস নিয়ে কথা বলছিল, তখন মেসি প্রস্তুতি নিচ্ছিল অমরত্বের। স্কালোনির তত্ত্বাবধানে একঝাঁক নতুন খেলোয়াড় নিয়ে ২০২২ সালের বিশ্বকাপের জন্য তৈরি হলেন নেতা মেসি। এমিলিয়ানো মার্তিনেজ ঘোষণা দিলেন – মেসির জন্য গোলপোস্টে জীবন দিতে প্রস্তুত তিনি। রদ্রিগো ডি’পল শারীরিকভাবে নিশ্চিত করলেন, মাঠে মেসিকে স্পর্শ করার আগে তাকে মোকাবিলা করতে হবে। আলভারেজ, ম্যাক অ্যালিস্টার কিংবা লাওতারো মার্তিনেজ ঘোষণা দিলেন – মেসির হয়ে রক্ত ঝরাবেন তারা। এতকিছুর পর ২০২২ বিশ্বকাপের প্রথম ম্যাচে আর্জেন্টিনা হেরে যায় সৌদি আরবের মতো ছোট দলের বিপক্ষে। আবারও যখন সবদিকে হায় হায়, মেসি বললেন, “আমাদের ওপর ভরসা রাখুন।”
সম্ভবত এর পরের ঘটনাগুলো আরব্য রজনির অনেক গল্পকেও হার মানাবে। আর কোন Poetic Injustice বা কাব্যিক অবিচারের শিকার হতে হয়নি মেসিকে।বার্সেলোনার ‘আনকারা মেসি’ হয়ে উঠলেন বিশ্বমঞ্চে ফুটবল নান্দনিকতার সবচেয়ে বড় বিজ্ঞাপন। কাতারের বালুর মরুভূমিতে লিখিত হলো এক মহাকাব্য। প্রথম ম্যাচে হারের পরও লড়াই চালিয়ে গেলেন। প্রতিটি ড্রিবল ছিল যেন একটি ছন্দ, প্রতিটি পাস ছিল যেন একটি অক্ষর, আর প্রতিটি গোল ছিল যেন একটি পূর্ণ ছত্র। নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে সেই পাস কিংবা ক্রোয়েশিয়ার বিপক্ষে সেই অলৌকিক ড্রিবল – সেগুলো অসংখ্য গোলের চেয়েও মুগ্ধতা ছড়ানো আয়োজন।
পুরো বিশ্বকাপে তার অসাধারণ নৈপুণ্য এবং গোলপোস্টে বাজপাখি এমিলিয়ানো মার্তিনেজের অতিমানবীয় রক্ষণ আর্জেন্টিনাকে করল বিশ্ব চ্যাম্পিয়ন। টুর্নামেন্টের সেরা খেলোয়াড়ের পাশাপাশি মেসি জিতলেন দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গোলদাতার পুরস্কার। মেসির বিশ্বকাপ জয়ের উন্মাদনা ছড়িয়ে পড়ল আর্জেন্টিনার রাজধানী বুয়েনোস আইরেসের রাজপথ থেকে বাংলাদেশের টিএসসি পর্যন্ত। ২০২২ সালের বিশ্বকাপ ফাইনাল ছিল তার আত্মার চূড়ান্ত পরীক্ষা। চাপ ছিল, ভয় ছিল – কিন্তু তার চোখে ভয় ছিল না। ছিল শান্তি, গভীর গ্রহণযোগ্যতা। যেন সে বলছে, “যা হওয়ার, হবে। আমি পালাব না।” সেই শান্তিটাই তাকে আলাদা করে দেয়। সেই শান্তি আমাদের শেখায় – মানবিক শক্তি গোল বা ট্রফিতে সীমাবদ্ধ নয়; মানবিক শক্তি হলো শেষ পর্যন্ত থাকা।
পেনাল্টিতে গঞ্জালো মন্তিয়েলের শট জালে ঢোকার সঙ্গে সঙ্গে ধারাভাষ্যকার পিটার ড্রুরির কণ্ঠে যেন এক অমর কবিতা উচ্চারিত হলো – “Montiel… Argentina, champions of the world. Again. At last. And the nation will tango all night long. 36 years ago since Maradona and Mexico, here finally is a nation’s new throng of immortals. Scaloni will be fated, Messi will be sainted. Lionel Messi has shaken hands with paradise. The little boy from Rosario, Santa Fe, has just pitched up in heaven. He climbs into a galaxy of his own. He has his crowning moment and of course he is not alone. He was beautiful. He was the point of difference. He has always been the point of difference. Unparalleled, and maybe today there will, of course, always be those who argue, always be those who debate. And the debate could rage on if you like. But as he falls in love with the object in the world that his heart most desired, it is hard to escape the supposition that he has rendered himself today, the greatest of all time.”
সেই কথাগুলো যেন হৃদয়ের গভীরে ধ্বনিত হয়ে উঠল। পৃথিবী থমকে গেল। আকাশ থেকে যেন সব তারা নেমে এসে তার চারপাশে নাচতে লাগল। সেই মুহূর্তে মেসি আর শুধু খেলোয়াড় ছিলেন না – তিনি হয়ে উঠলেন এক কবিতা, যা পড়তে পড়তে সারা বিশ্ব কাঁদল, হাসল, ভালোবাসল।

অষ্টম ব্যালন ডি’অর জয়ের রাতে, যখন সে মঞ্চে উঠল, গোটা হলঘর দাঁড়িয়ে গেল। ওটা করতালি ছিল না, ওটা ছিল ইতিহাসের নীরব সম্মতি। সবাই দাঁড়িয়ে বলছিল – আমরা দেখেছি, আমরা সাক্ষী ছিলাম। তার চোখে তখন বিস্ময় ছিল না, ছিল কেবল শান্ত স্বীকৃতি। কারণ সে জানে, এই সম্মান তার জয়ের জন্য নয় – এই সম্মান তার নীরবতার জন্য, সহ্য করার জন্য।
মেসি আমার কাছে কোনো কিংবদন্তি নয়। কিংবদন্তিরা দূরে থাকে, গল্পের পাতায় বাঁধা থাকে। মেসি কাছে থাকে। সে ভাঙা মানুষের পাশে থাকে – যারা চেষ্টা করে, যারা হারে। মেসি শিখিয়েছে – ভালোবাসা মানে জিততে হবে না; ভালোবাসা মানে শেষ পর্যন্ত থাকা। নেতৃত্ব মানে চিৎকার নয়; নেতৃত্ব মানে নীরব অধ্যবসায়। মেসি কোনো অর্জনের নাম নয়। সে অনুভূতির ভাষা। তাকে নিয়ে যতই লিখি, মনে হয় না “ভালো লিখেছি”; মনে হয় – নিজেকে উজাড় করে দিয়েছি। আমার চোখ, আমার হৃদয়, আমার শব্দ – সবই তার প্রতি উজাড়।
মেসিকে ভালোবাসা মানে আনন্দ নয়; ভালোবাসা মানে নিঃশ্বাসে থাকা, ভাঙা মুহূর্তগুলোকে ধীরে ধীরে শক্তিতে রূপান্তর করা। প্রতিটি ড্রিবল, প্রতিটি নীরবতা, প্রতিটি নিঃশ্বাস – সবই যেন নদীর ঢেউ, ধীরে, গভীর, অবিরাম বয়ে চলা। এই লেখাটা শুধু লেখা নয়। এটা এক বহমান নদীর মতো শব্দের ধারাপাত, যেখানে প্রতিটি বাক্য হৃদয় ছুঁয়ে যায়, চোখে জল আনে, আর বলে দেয় – কিছু মানুষকে লেখা যায় না, শুধু অনুভব করা যায়।


Discussion
No comments yet.