
১৯৯০-এর দশকের বাংলা গানের আকাশে যেন একটা বিদ্রোহী ঝড় উঠেছিল—ধুলো-ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন নগরের রাস্তায়, মানুষের বুকের গভীরে প্রতিবাদের আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছিল। ব্যান্ডের তালে তালে জীবনমুখী গানের এক অমোঘ স্রোত বয়ে গিয়েছিল, যা সমাজের ক্ষত, রাজনৈতিক অন্ধকার এবং মানুষের অভ্যন্তরীণ বিদ্রোহকে ছুঁয়ে যেত। কবির সুমন যেমন জীবনের দার্শনিক ছায়ায় আলো খুঁজতেন, অঞ্জন দত্ত নগরের একাকীত্বকে কবিতায় বুনতেন, তেমনি নচিকেতা চক্রবর্তীর গান ছিল এক একটি জ্বলন্ত তীর। তাঁর গানগুলো শোষণের হৃদয় বিদ্ধ করে, দুর্নীতির মুখোশ ছিঁড়ে ফেলে, অবিচারের বিরুদ্ধে অগ্নিশিখা জ্বালিয়ে তোলে। আমি আগে সুমন নিয়ে লিখেছি, ভবিষ্যতে অঞ্জন নিয়েও লিখব; কিন্তু আজকের লেখাটা নচিকেতাকে নিয়ে—যাঁর কণ্ঠ যেন এক বিদ্রোহী নদী, যা রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝ দিয়ে প্রবাহিত হয়ে শ্রোতাদের অন্ধকার থেকে আলোর দিকে টেনে নেয়।
নচিকেতা চক্রবর্তীকে অনেক সময় জীবনমুখী গানের শিল্পী হিসেবে সহজ করে দেখা হয়। এই দেখা আসলে অসম্পূর্ণ। নচিকেতা কেবল প্রতিবাদ করেন না, তিনি প্রশ্ন করেন। প্রশ্ন করেন এমন এক ভঙ্গিতে, যেখানে রাষ্ট্র, সমাজ—এমনকি শ্রোতাও—নিরাপদ থাকে না। তাঁর গান রাজনৈতিক, কারণ সেগুলো ক্ষমতার কাঠামোকে নাড়িয়ে দেয়; কিন্তু সেই রাজনীতি দলীয় নয়—নৈতিক। নচিকেতা মূলত একজন রাজনৈতিক নাগরিক, যিনি গানকে ব্যবহার করেছেন রাষ্ট্র, সমাজ এবং নাগরিক দায়িত্বের মধ্যেকার অস্বস্তিকর সম্পর্কগুলোকে উন্মোচন করার জন্য। তাঁর গান ব্যক্তিগত অনুভূতির কথা বললেও, সেই অনুভূতিগুলো কখনোই রাজনৈতিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন নয়।
নচিকেতার গানে রাজনীতি মানে মিছিল নয়, স্লোগান নয়। গানের মাধ্যমে তিনি শিখিয়েছেন—রাজনীতি মানে মানুষের দৈনন্দিন বেঁচে থাকার ভেতরে ঢুকে থাকা অদৃশ্য শোষণ, আপস আর ভণ্ডামি। প্রতিবাদের কবি-যোদ্ধা নচিকেতা চক্রবর্তীর জন্ম ১৯৬৪ সালে কলকাতার ধুলোয়। রেডিওর মাইকে তাঁর যাত্রা শুরু হলেও ১৯৯০-এর দশকে “এই বেশ ভালো আছি” বা “আমি এক যাযাবর”-এর মতো অ্যালবামগুলো সমাজের রাজনৈতিক রাত্রিকে আলোকিত করে তোলে। তাঁর প্রভাব বাংলা লোকসঙ্গীতের গভীর শিকড়ে, বব ডিলানের বিদ্রোহী আত্মায় এবং রাজনীতির তিক্ত বাস্তবতায় প্রোথিত। নচিকেতার গানে রাজনৈতিক দর্শন যেন এক জ্বলন্ত কবিতা—নিওকলোনিয়াল শক্তির বিরুদ্ধে সাহিত্যিক প্রতিরোধ, দুর্নীতির কঠোর সমালোচনা, পুলিশের অত্যাচার, নির্বাচনী প্রহসন এবং অসমতার বিরুদ্ধে অগ্নিময় আহ্বান। এগুলো শুধু ব্যক্তিগত ক্লান্তির কথা নয়; বরং এক বৃহত্তর রাজনৈতিক মহাকাব্য, যা শ্রোতাদের বিপ্লবের অন্ধকার গহ্বর থেকে আলোর পথে ডেকে নেয়।
নচিকেতার রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে বড় বৈশিষ্ট্য হলো—তিনি রাষ্ট্রের সঙ্গে সরাসরি তর্কে যান না; বরং রাষ্ট্র যে মানুষ বানাতে চায়, সেই “আদর্শ নাগরিক”-এর মুখোশ খুলে দেন। তাঁর কাছে রাজনৈতিক আলোচনা মানে শুধু পার্লামেন্ট নয়। রাজনীতি মানে চাকরি না পাওয়া যুবক, মিথ্যে আশ্বাসে ক্লান্ত মধ্যবিত্ত, আর নীরব থাকতে শেখানো সাধারণ মানুষ। এই দর্শনটাই আমরা দেখি ‘ব্রাত্য জনতা’, ‘রাজনৈতিক গান’, ‘অনুপস্থিত ভোটার’—এ ধরনের গানে। তাঁর লিরিক্স সরাসরি, কথোপকথনমূলক এবং নৈতিকতাবাদী। তাঁর গানে যেমন অন্ধকার রাত্রির মধ্যে প্রতিবাদের তারকা জ্বলে ওঠে, তেমনি সমাজের জন্য থাকে দার্শনিক দিকনির্দেশনা।
আসলে নচিকেতার উত্থান যে সময়টায়, সেটি ছিল এক অদ্ভুত রাজনৈতিক পর্ব। আদর্শগত রাজনীতি ক্লান্ত, বামপন্থা প্রশাসনে পরিণত, মধ্যবিত্ত আপসকামী, আর প্রতিবাদ নেমে আসছে ব্যক্তিগত পর্যায়ে। এই সময় নচিকেতা আবির্ভূত হন এমন একজন শিল্পী হিসেবে, যিনি মঞ্চে দাঁড়িয়ে চিৎকার করেন না; বরং শান্ত গলায় ভয়ংকর প্রশ্ন করেন। তাঁর রাজনীতি স্লোগাননির্ভর নয়; তাঁর রাজনীতি নাগরিক অভিজ্ঞতাভিত্তিক। নচিকেতার রাজনৈতিক দর্শনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো—তিনি বড় বিপ্লবের কথা বলেন না; বলেন ছোট ছোট আপসের কথা, যেগুলো মিলেই রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে এবং নাগরিককে দুর্বল করে।
তাঁর গানে উঠে আসে ভোট দিয়ে ভুলে যাওয়া নাগরিক, প্রতিবাদ করতে ভয় পাওয়া মধ্যবিত্ত, ক্ষমতার কাছে মাথা নোয়ানো বুদ্ধিজীবী এবং নিরাপত্তার বিনিময়ে স্বাধীনতা বিক্রি করা মানুষ। এগুলো কোনো বিমূর্ত রাজনৈতিক তত্ত্ব নয়; এগুলো দৈনন্দিন নাগরিক রাজনীতি। নচিকেতার গানে রাষ্ট্র কখনোই রোমান্টিক নয়। রাষ্ট্র তাঁর কাছে প্রশ্নহীন কর্তৃত্ব, আমলাতান্ত্রিক নিষ্ঠুরতা, সুবিধাভোগীদের রক্ষাকবচ এবং সাধারণ মানুষের জন্য শর্তসাপেক্ষ আশ্রয়। তিনি দেখান—রাষ্ট্র নাগরিককে ভালোবাসে না; রাষ্ট্র নাগরিককে ব্যবহার করে। নাগরিকও রাষ্ট্রকে প্রশ্ন না করে মেনে নেয়—এটাই নচিকেতার রাজনৈতিক চেতনার সবচেয়ে বড় আক্ষেপ। এই জায়গায় নচিকেতা একজন শিল্পী নন; বরং একজন অসন্তুষ্ট নাগরিক চিন্তক।
নচিকেতার গানে সবচেয়ে কঠোর সমালোচনার মুখোমুখি হয় মধ্যবিত্ত শ্রেণি। কারণ এই শ্রেণিই সবচেয়ে বেশি সুবিধা পায়, আবার সবচেয়ে বেশি আপস করে। মধ্যবিত্ত নৈতিকতার কথা বলে, কিন্তু ঝুঁকি নিতে চায় না। নিরাপত্তা, চাকরি এবং সামাজিক গ্রহণযোগ্যতার বিনিময়ে সে ধীরে ধীরে নিজের প্রশ্ন করার অধিকারটুকুও বিসর্জন দেয়। নচিকেতা এই ভণ্ডামিটাকে সরাসরি আক্রমণ করেন না; বরং আয়নার মতো তুলে ধরেন—যাতে শ্রোতা নিজেই নিজের মুখ দেখতে বাধ্য হয়।
তাঁর গানগুলোতে নেতৃত্বের ধারণাও খুব ঠাণ্ডা মাথায় ভেঙে দেওয়া হয়। নেতা আসে, যায়, ক্ষমতা বদলায়—কিন্তু সাধারণ মানুষের জীবনের মৌলিক সংকটগুলো থেকে যায়। এই জায়গায় নচিকেতার রাজনীতি কোনো বিপ্লবী স্বপ্ন দেখায় না; বরং বাস্তবতার ভারটা শ্রোতার কাঁধে তুলে দেয়। নচিকেতার প্রতিবাদ কখনো উচ্চকণ্ঠ নয়। তিনি মিছিলের ভাষা ব্যবহার করেন না। তাঁর কণ্ঠে আছে নাগরিক ক্লান্তি, হতাশা এবং এক ধরনের সংযত রাগ। এই সংযমই তাঁকে আলাদা করে তোলে। তিনি জানেন—চিৎকারে নয়, বরং অস্বস্তিতে মানুষ বদলায়।

চলুন, কয়েকটি গানের মধ্য দিয়ে দেখি কীভাবে রাজনৈতিক দর্শন কাব্যিক গভীরতা নিয়ে উঠে আসে। “এই বেশ ভালো আছি” গানটিকে ব্যাখ্যা করা যায় মুখোশের পেছনে লুকানো বিষণ্ন মুখের কাব্যিক স্যাটায়ার হিসেবে। গানের কথাগুলো এমন—
“এই বেশ ভাল আছি।
এই বেশ ভাল আছি।
এই বেশ ভাল আছি, কর্ম কাজ নেই, গাড়ি ঘোড়া কিছু নেই,
অফিস কাচারি নেই, হাজিরা কামাই নেই,
শব্দ বা পরিবেশ দূষণ বালাই নেই,
সময় দেই না বলে, তেলে বেগুণ জ্বলে গিন্নীর রাগ নেই,
টেলিফোনে ডাক নেই, শহরেতে কারফিউ, লোকজন কেউ নেই,
এক-চার-চার ধারা, ফুটপাথে থাকে যারা, কেউ কোথ্ থাও নেই,
নেই নেই কিছু নেই, তবুও তো আছে কিছু, বলতে যা বাধা নেই…”
এখানে নচিকেতা বাহ্যিক শান্তির আড়ালে লুকানো শোষণের চক্রকে উন্মোচন করেন। এটি এক ধরনের দার্শনিক ডিড্যাকটিক টোন নেয় – যেন ঘুমন্ত সমাজের বুকে বিদ্রোহের বীজ বপন করে। ক্যামুর অ্যাবসার্ডিটির মতো জীবনের অর্থহীনতাকে চ্যালেঞ্জ করে।
“এই বেশ ভালো আছি” গানটিতে রাজনৈতিক প্রজ্ঞার পাশাপাশি আছে সাম্প্রদায়িকতার কথাও। নচিকেতা এই গানে সরাসরি সাম্প্রদায়িক দাঙ্গা, ধর্মীয় হিংসা বা রক্তপাতের বর্ণনা দেন না। বরং তিনি যেটা করেন, সেটা আরও ধারালো – তিনি দেখান সহিংসতার সময় যে ‘নীরব স্বস্তি’ তৈরি হয়, সেটাই আসলে সাম্প্রদায়িকতার সবচেয়ে বড় জ্বালানি। এই গানের মূল ভঙ্গি ব্যঙ্গাত্মক। “সব ঠিক আছে” বলা হচ্ছে এমন এক সমাজে, যেখানে চারপাশে ভয় আছে, কিন্তু ভয়টা আর কাউকে নাড়ায় না, অন্যের ওপর অত্যাচার হচ্ছে, কিন্তু “আমার তো হয়নি” – এই যুক্তিতেই মানুষ নিশ্চিন্ত, প্রতিবেশী পুড়ছে, কিন্তু নিজের ঘর অক্ষত থাকলেই তাকে বলা হচ্ছে শান্তি! এখানে সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ঘটনার স্তরে নয়, বরং মনস্তাত্ত্বিক স্তরে ধরা পড়ে।
নচিকেতার “সরকারি কর্মচারী” গানটি বাংলা গানের জগতে একটা ক্লাসিক স্যাটায়ার (ব্যঙ্গাত্মক গান)। এর মাধ্যেম সরকারি অফিসের কর্মচারীদের দৈনন্দিন জীবনের অলসতা, দায়িত্বহীনতা, ফাঁকিবাজি এবং দুর্নীতির একটা কঠোর কিন্তু হাস্যরসাত্মক চিত্র এঁকেছেন তিনি। নচিকেতা এখানে সরাসরি সমাজের একটা বড় অংশকে (সরকারি চাকরির মানুষদের) লক্ষ্য করে ব্যঙ্গ করেছেন, কিন্তু গানের টোন এতটাই মজার এবং ছন্দময় যে শুনতে শুনতে হাসি পায়, আবার ভাবতেও বাধ্য করে। গানের লিরিক্সের কয়েকটা মূল অংশ (যতদূর সঠিকভাবে পাওয়া যায়) গানটা শুরু হয় এভাবে:
বারোটায় অফিস আসি, দুটোয় টিফিন
তিনটেয় যদি দেখি সিগন্যাল গ্রীন
চটিটা গলিয়ে পায়ে, নিপাট নির্দ্বিধায়
চেয়ারটা কোনোমতে ছাড়ি
কোনো কথা না বাড়িয়ে, ধীরে ধীরে পা বড়িয়ে
চারটেয় চলে আসি বাড়ি
আমি সরকারি কর্মচারী… আমি সরকারি কর্মচারী
সরকারী কর্মচারীদের ঘুষ খাওয়া নিয়ে ব্যাঙ্গ করে তিনি বলেন –
ঘুষ আমার ধর্ম ঘুষ আমার কর্ম
ঘুষ নিতে কি শংসয় ?
প্রকাশ্যে চুমু খাওয়া এই দেশে অপরাধ
ঘুষ খাওয়া কখনই নয়।
তাই কারো ফইল পাস করে নির্লজ্জের মত
হাত খানা পেতে দিতে পারি।
আমি সরকারি কর্মচারী…।।
আর নচিকেতার সবচেয়ে শক্তিশালী প্রতিবাদী এবং বিপ্লবী গানগুলোর একটা “হল্লাবোল” – এক ঝড়ের মতো কাব্যিক আহ্বান, বিপ্লবের মহাকাব্য। এটি মূলত দুর্নীতি, কালো টাকা, শোষণ, অবিচার এবং সামাজিক-রাজনৈতিক অস্থিরতার বিরুদ্ধে একটা সরাসরি, আগুনময় আহ্বান। গানটি নচিকেতার অ্যালবাম বা লাইভ পারফরম্যান্সে (যেমন “আমি ই নচিকেতা” সিরিজ বা EKOK নচিকেতা ইভেন্টে) প্রায়ই গাওয়া হয়েছে। এর থিম খুবই স্পষ্ট – জনতাকে জাগিয়ে তোলা, রাস্তায় নামানো এবং শোষণের বিরুদ্ধে হল্লা (আওয়াজ তোলা) করা। গানের মূল লিরিক্সের কয়েকটা অংশ (সাধারণত যা শোনা যায়) গানটা শুরু হয় এমন একটা আহ্বান দিয়ে:
হল্লাবোল, হল্লাবোল
এই অবিচারের বিরুদ্ধে হল্লাবোল
জনতা জাগো, রাস্তায় নামো
এই শোষণের শেষ করো…
আরও কিছু লাইন যা বিভিন্ন ভার্সনে শোনা যায়:
কিসমৎ কে মুঠোয় রেখে ঝড়ের মুখে হাল্লা বোল
জীবনেতে না পাওয়া হাজার সুখে হাল্লা বোল
ভুলে যা, যা ভুলে যা দুনিয়াদারী
পাগল রোজ রোজ মরার চেয়ে একদিন বাঁচাই হোক সম্বল…
এই লিরিক্সগুলো থেকে স্পষ্ট যে, গানটা শুধু অভিযোগ নয়, এটা অ্যাকশনের কল। তার এই গানে রাজনৈতিক দর্শন মার্কসবাদী আগুনে জ্বলে – শ্রেণিসংগ্রাম এবং জনতার উত্থানকে উৎসাহিত করে।
“ভোট ভোট” নির্বাচনী প্রহসনের কাব্যিক ব্যঙ্গ। গণতন্ত্রের আড়ালে লুকানো দুর্নীতি ও ম্যানিপুলেশনকে উন্মোচন করে। গানটি একটা নির্বাচন-কেন্দ্রিক প্রতিবাদী গান, যা ২০২১ সালে রিলিজ হয়েছে (Red Ribbon Entertainment-এর অধীনে, মিউজিক ও লিরিক্স Raja Nag-এর সহযোগিতায়)। এটা পশ্চিমবঙ্গের বিধানসভা নির্বাচনের সময়কার প্রেক্ষাপটে লেখা এবং এর মূল থিম হলো ভোটের নামে চলা রাজনৈতিক নাটক, দলবদল, ভোটারদের বিভ্রান্তি এবং গণতন্ত্রের প্রহসন। গানটা খুবই স্যাটায়ারিক (ব্যঙ্গাত্মক), কিন্তু সরাসরি এবং ক্যাচি – শুনলে হাসি পায়, আবার ভাবায়। গানের মূল লিরিক্সের কয়েকটা অংশ (Spotify/JioSaavn থেকে পাওয়া) গানটা শুরু হয় এভাবে:
ভোট ভোট ভোট
ডাইনে বায়ে রাজনীতি ঘর মেতে চলছে
দল বদলের নীতি ঘরে ঘরে জমছে
দাদা, দিদি, পিসি, মাসি ঘর বদলাছে
ভোট ভোট ভোট ভোট ভোট ভোট…
এখানে “ডাইনে বায়ে” মানে ডান-বাম (রাজনৈতিক দলের ইঙ্গিত) এবং পুরো পরিবার/সমাজ জুড়ে দলবদলের ঢেউ চলছে।
নচিকেতা চক্রবর্তীর প্রতিবাদী গানের আরো একটা ক্লাসিক উদাহরণ হচ্ছে “ও ডাক্তার”। এর মূল বিষয় হচ্ছে স্বাস্থ্যসেবা ব্যবস্থার দুর্নীতি, চিকিৎসকদের বাণিজ্যিকীকরণ, রোগীদের শোষণ এবং প্রফেশনের অবক্ষয়। নচিকেতা এখানে খুব কঠোর, ব্যঙ্গাত্মক এবং সরাসরি ভাষায় চিকিৎসা-ব্যবসায়ের অন্ধকার দিকগুলোকে তুলে ধরেছেন, যা নব্বই থেকে শূন্যের দশকে (এবং আজও) খুব প্রাসঙ্গিক ছিল। গানের মূল লিরিক্সের কয়েকটা অংশ (স্ট্যান্ডার্ড ভার্সন থেকে) গানটা শুরু হয় এভাবে:
ও ডাক্তার, ও ডাক্তার…
তুমি কতশত পাস করে
এসেছ বিলেত ঘুরে
মানুষের যন্ত্রণা ভোলাতে
ও ডাক্তার, ও ডাক্তার…
তোমার এম.বি.বি.এস না না এফ.আর.সি
বোধহয় এ টু জেড ডিগ্রী ঝোলাতে
ও ডাক্তার, ও ডাক্তার…
আরও গুরুত্বপূর্ণ অংশগুলোর মধ্যে আছে –
ডাক্তার মানে সে তো মানুষ নয়
আমাদের চোখে সে তো ভগবান
কসাই আর ডাক্তার একইতো নয়
কিন্তু দুটোই আজ প্রফেশান
কসাই জবাই করে প্রকাশ্য দিবালোকে
তোমার আছে ক্লিনিক আর চেম্বার
ও ডাক্তার, ও ডাক্তার…
ডাক্তার চাইবেন রক্ত রিপোর্ট
ক্লিনিকের সন্ধানও তিনিই দেবেন
একশত টাকা যদি ক্লিনিকের বিল হয়
অর্ধেক দালালী তিনিই নেবেন
রোগীরা তো রোগী নয় খদ্দের এখন
খদ্দের পাঠালেই কমিশান
ক্লিনিক আর ডাক্তার কী টুপি পড়াচ্ছে
বুঝছেনা গর্দভ জনগন
কসাই জবাই করে প্রকাশ্য দিবালোকে
ওদের আছে ক্লিনিক আর চেম্বার
ও ডাক্তার, ও ডাক্তার…
নচিকেতার গানে জীবনভিত্তিক আলোচনা থাকলেও (“বৃদ্ধাশ্রম”-এর মতো), রাজনৈতিক দর্শনই প্রধান। গানের মাধ্যমে তিনি নিওকলোনিয়াল শক্তির বিরুদ্ধে সাহিত্যিক প্রতিরোধ গড়ে তোলেন। তাঁর লিরিক্স সোশ্যাল মরালিস্টিক এবং আবেগীয়, যা অসমতা এবং অবিচারের বিরুদ্ধে দাঁড়ায়। এটি একটা সাহিত্যিক ডিসকোর্স, যা পপুলার মিউজিকে রাজনৈতিক সমালোচনাকে নতুন কাব্যিক গভীরতা দেয়, যেন একটা নদীর প্রবাহ যা সমাজের ময়লা ধুয়ে নেয়।
নচিকেতা চক্রবর্তীর গান রাজনৈতিক দর্শনের একটা কাব্যিক আয়না যা মূলত সমাজের শিকল ভাঙার অগ্নিময় মাধ্যম। তাঁর কণ্ঠ যেন একটা বিদ্রোহী নদী, যা রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে প্রবাহিত হয়ে শ্রোতাদেরকে স্বাধীন চিন্তার অন্ধকার থেকে আলোর দিকে নেয়। আজকের বিশ্বে, যেখানে রাজনীতি প্রায়ই ম্যানিপুলেটিভ, নচিকেতার গান আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয় যে, প্রতিবাদই পরিবর্তনের চাবিকাঠি – একটা সাহিত্যিক বিপ্লব যা জীবনের ঠাস বুনোটের বৃত্ত থেকে মুক্তি দেয়।
আজকের সময়ে, যখন রাজনৈতিক সচেতনতা অনেকটাই সোশ্যাল মিডিয়ার প্রতিক্রিয়াশীলতায় সীমাবদ্ধ, নচিকেতা আরও বেশি প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠেন। কারণ তিনি তাত্ক্ষণিক আবেগ তৈরি করেন না; তিনি দীর্ঘস্থায়ী প্রশ্ন তৈরি করেন। তার গান শোনার পর কেউ তৎক্ষণাৎ বিপ্লবী হয়ে ওঠে না, কিন্তু নিজের অবস্থান নিয়ে অস্বস্তিতে পড়ে। নচিকেতা তাই কেবল একজন গায়ক নন। তিনি একটি চলমান রাজনৈতিক প্রশ্ন। তার গান শেষ হয়ে যায়, কিন্তু প্রশ্ন থেকে যায় – আমরা কি সত্যিই নাগরিক, নাকি কেবল নিরাপদ থাকার বিনিময়ে নীরব হয়ে যাওয়া দর্শক?
এই প্রশ্নের কোনো সরল উত্তর নেই। আর সম্ভবত, উত্তর না থাকাটাই নচিকেতার গানের সবচেয়ে রাজনৈতিক দিক।
উৎস: নচিকেতার অ্যালবাম, লিরিক্স ও বিভিন্ন সাক্ষাৎকার থেকে অনুপ্রাণিত।


Discussion
No comments yet.