
নব্বইয়ের দশকের বাংলা গানের মানচিত্রে অঞ্জন দত্ত কোনো ঝড় ছিলেন না, ছিলেন এক দীর্ঘ সন্ধ্যা। কোনো স্লোগান নয়, কোনো মিছিল নয় – বরং তার গান মানে ধূসর ফুটপাথ, বাসস্ট্যান্ডের অপেক্ষা, ফুরিয়ে আসা প্রেম আর মধ্যবিত্ত জীবনের অনুচ্চারিত দীর্ঘশ্বাস। যেখানে কবির সুমন প্রশ্ন তুলেছিলেন জীবনের দর্শন নিয়ে, নচিকেতা নাগরিক অসন্তোষকে রাজনৈতিক ভাষা দিয়েছিলেন, সেখানে অঞ্জন দত্ত দাঁড়িয়ে ছিলেন আরেক জায়গায় – নগরের ব্যক্তিগত বেদনার সীমানায়।
অঞ্জন দত্তকে বোঝার জন্য প্রথমে যে জিনিসটা মেনে নিতে হয়, তা হলো – তিনি কোনো “বড়” বক্তব্যের শিল্পী নন। তিনি সমাজ বদলাতে চান না, মানুষকে জাগাতে চান না, কোনো আদর্শ দাঁড় করাতে চান না। অঞ্জন দত্ত মূলত পর্যবেক্ষক। তিনি শহরের ভেতরে থাকা মানুষের জীবন কীভাবে ধীরে ধীরে ক্ষয়ে যায়, সেটার নোট রাখেন। এই নোটগুলোই তার গান। মানুষ যখন নাগরিক জীবনের লড়াইয়ে ব্যস্ত অঞ্জন দত্ত তখন শহরের এক কোণে দাঁড়িয়ে পর্যবেক্ষন করছিলেন – মানুষ কীভাবে ক্লান্ত হয়, কীভাবে ভালোবাসে, কীভাবে হার মানে, আর কীভাবে সেই হার মানাটাকেই জীবনের নিয়ম বলে মেনে নেয়।
অঞ্জন দত্ত বাংলা গানের ইতিহাসে কোনো বিস্ফোরণ নন। তিনি আগুন ধরান না, তিনি আলো জ্বালান না, বরং তিনি সন্ধ্যার মতো – ধীরে নামে, চারপাশ নিঃশব্দ করে দেয়, আর মানুষের ভেতরের কথাগুলোকে আরও স্পষ্ট করে তোলে। তার গানে ছিল শহুরে মানুষের ক্লান্তি, সম্পর্কের অসম্পূর্ণতা, মধ্যবিত্ত জীবনের আপস এবং ভালোবাসার সীমাবদ্ধতা। তিনি এমন এক বাস্তবতাকে ধরেছিলেন, যা খুব পরিচিত অথচ খুব কম আলোচিত।
নগরের সন্ধ্যায় যখন নিয়নের আলো রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ে, বাতাসে ভেসে আসে পুরোনো বাড়ির দেয়াল থেকে ধুলোমাখা স্মৃতির গন্ধ, তখন অঞ্জন দত্তের গানে উঠে আসে সেই ছায়ার মধ্যে লুকিয়ে থাকা একটা মানুষের হৃদয়ের ধুকপুকুনি। নব্বইয়ের দশকের সেই নব্য-নাগরিক কোলাহলের মাঝে মধ্যবিত্তের স্বপ্নগুলো যখন চুপিচুপি ভেঙে পড়ত, অঞ্জন দত্ত তখন এলেন মধ্যবিত্তের নীরব যন্ত্রণার কবিতা নিয়ে। কোনো দর্শনের ভারী বোঝা কাঁধে চাপিয়ে নয়, তিনি আসেন শুধু একটা পুরোনো গিটার হাতে, আর মনে একটা গভীর, নরম, অথচ অবিরাম যন্ত্রণা নিয়ে। তার গিটারের সুরে ছিলো নগরের একাকীত্ব, ব্যক্তির প্রেমের অসম্ভব আকাঙ্ক্ষা, পাওয়ার চেয়ে না-পাওয়ার বেশি সত্যতা, আর মধ্যবিত্ত জীবনের ছোট ছোট কিন্তু অসহ্য কষ্ট! চিৎকার নয়, তার গানের কথা আর সুর জুড়ে শুধুই নীরব রক্তক্ষরণ!
তাঁর গানে নাগরিক জীবনের ছবি গ্ল্যামারাস রূপে নয় বরং উঠে আসে নীরস যান্ত্রিকতায়, ব্যর্থতার ছায়ায় – যেখানে শহরের ভিড়ে মানুষ হারিয়ে যায় নিজেকে, আর মধ্যবিত্তের ছোট স্বপ্নগুলো ভেঙে পড়ে দৈনন্দিনের চাপে। তার গানে নগর কোনো সৌন্দর্যের প্রতীক নয়। এটি একটি কার্যকরী, যান্ত্রিক, নির্দয় জায়গা – যেখানে মানুষ বসবাস করে, কিন্তু গভীরভাবে সংযুক্ত থাকে না। তার গানের চরিত্ররা এই শহরে কাজ করে, প্রেমে পড়ে, বিচ্ছিন্ন হয় এবং আবার পরের দিন কাজে ফিরে যায়। এই চক্রটাই তার গানের মূল কাঠামো। তাঁর গানে শহরটা কখনো শুধু পটভূমি নয়, সে নিজেই একটা জীবন্ত চরিত্র – একাকী, নিষ্ঠুর, কিন্তু অদ্ভুতভাবে আকর্ষণীয়। “পুরোনো গিটার”-এ তিনি বলেন –
এই বুড়ো পুরনো গিটার দিয়েছে, কত কিছু দিয়েছে
ছোটখাট সুখ, মান অভিমান, দুঃখের গান দিয়েছে
রোজ রোজ কত কত হাজার হাজার ভয় মনে যখন ভিড় করেছে
ঘরের কোণে আপন মনে, সেই ভয়গুলো কাটিয়ে দিয়েছে
ছেলেবেলার সেই পাতাঝরা পাহাড়ে ঘুরেছে একেবেকে মন যখন
এই বুড়ো পুরনো গিটার ছিল সঙ্গী আমার তখন…
তখন শহরের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া সেই ছেলেবেলার স্মৃতি আর বর্তমানের নিঃসঙ্গতা একসঙ্গে মিশে যায়। গিটারটা যেন একমাত্র সঙ্গী, যে কথা বলে না, কিন্তু বোঝে যে শহরের নিয়ন আলো পৌছায় না মনের অন্ধকার কোণে। নগরের এই একাকীত্ব অঞ্জনের গানে প্রেমের সঙ্গে এমনভাবে জড়িয়ে যায় যেন প্রেমই একমাত্র আলো, কিন্তু সেই আলোও প্রায়শই ম্লান, অধরা, ছুঁয়ে যাওয়ার আগেই ফুরিয়ে যায়। এখানে নাগরিক জীবনের ব্যর্থতা ফুটে ওঠে – শহর যতই বড় হোক, মানুষের ছোট ছোট সুখগুলো যেন হারিয়ে যায় তার ভিড়ে, আর গিটারের সুরে শুধু স্মৃতির ছায়া বাকি থাকে।
প্রেম তাঁর গানে কখনো আকাশছোঁয়া রোমান্টিকতা নয়, বরং ঘরোয়া, রক্তমাংসের! এই প্রেমে ভালোবাসা থাকে, কিন্তু সঙ্গে থাকে বিচ্ছেদের ছুরি, না-পাওয়ার বিষ, আর অভিমানের নরম কাঁটা। “রঞ্জনা আমি আর আসব না”-এর সেই বিদায়ী সুর যেন একটা দীর্ঘশ্বাস:
পাড়ায় ঢুকলে ঠ্যাং খোঁড়া করে দেবো
বলেছে পাড়ার দাদারা
অন্য পাড়া দিয়ে যাচ্ছি তাই
রঞ্জনা, আমি আর আসবো না
এখানে, রঞ্জনা, আমি আর আসবো না…
এখানে প্রেমের পথে সমাজের বাধা, ধর্মের ছায়া, পাড়ার দাদাদের হুমকি – সব মিলে একটা অসম্ভবতার দেয়াল তৈরি করে। প্রেমিক বিদায় নেয়, কিন্তু তার বিদায়ে লুকিয়ে থাকে অসীম বেদনা, যেন না-আসাটাই একমাত্র সম্ভব ভালোবাসা। এই গানে ব্যক্তিগত জীবনের নাগরিকতা ফুটে ওঠে শহরের সামাজিক চাপে – মধ্যবিত্তের প্রেম যেন সবসময় ব্যর্থতার ছায়ায় ঢাকা, যেখানে সমাজের নিয়মগুলো ব্যক্তির স্বপ্নকে ছিন্নভিন্ন করে। আর “তুমি না থাকলে”-এ প্রেম হয়ে ওঠে জীবনের সমস্ত রঙের উৎস, কিন্তু তার অনুপস্থিতিতে সবকিছু যেন অর্থহীন:
তুমি না থাকলে সকালটা এতো মিষ্টি হতো না
তুমি না থাকলে মেঘ করে যেত বৃষ্টি হতো না
তুমি না থাকলে চাঁদটার গায়ে পড়ে যেত মরচে
তুমি না থাকলে কিপটে লোকটা হতো না খরচে
তুমি না থাকলে দেবদাস কবে হয়ে যেত ক্ষুদিরাম
তুমি না থাকলে শুধু ডানদিক থাকত না কোনো বাম…
এই লাইনগুলোতে প্রেমের অনুপস্থিতিতে জীবনের সবকিছু যেন বিপর্যস্ত হয়ে যায় – দৈনন্দিনের ছোট ছোট জিনিস থেকে শুরু করে সমাজের বড় বড় দ্বন্দ্ব পর্যন্ত। মধ্যবিত্তের ব্যক্তিগত জীবনে নাগরিকতার যন্ত্রণা এখানে ফুটে ওঠে গভীরভাবে। শহরের যান্ত্রিকতায় প্রেম যেন একমাত্র আশ্রয়, যা না থাকলে সবকিছু ব্যর্থতায় ডুবে যায়, যেন জীবনের রঙ মুছে যায় মরচে ধরে।

আর মধ্যবিত্তের যন্ত্রণা? অঞ্জন দত্তের গানে সেটা যেন একটা নীরব নদী, যা সারাক্ষণ বয়ে চলে কিন্তু কখনো চিৎকার করে না। “লাশকাটা এই শহরে”-এ তিনি লেখেন:
লাশকাটা এই শহরে, আমি জীবন্ত লাশ
নামটা শুনেছি পড়িনি আমি, জীবনানন্দ দাশ
দশটা পাঁচটা মনটা আমার করে শুধু হাঁস ফাঁস
মাসের প্রথম দিনটার অপেক্ষায়
চেপে চেপে রেখে মান অভিমান, টিপে টিপে খরচা…
এই লাইনগুলো মধ্যবিত্ত জীবনের যান্ত্রিকতাকে ছুরির মতো বিঁধে। চাকরির দশটা-পাঁচটা, মাসের শেষে টাকার হিসেব, অভিমান চেপে রাখা, খরচ টিপে টিপে করা – সব মিলে একটা জীবন্ত লাশের ছবি। শহরটা লাশ কাটার ঘরের মতো, যেখানে স্বপ্নগুলো মরে যায় চুপিচুপি। মূল্যবোধের সংকটও এখানে ফুটে ওঠে – সততা, সম্পর্ক, ভালোবাসা – সবকিছু যেন শহরের নিয়ন আলোয় ম্লান হয়ে যায়, কিন্তু তবু মানুষ বেঁচে থাকে, গান গায়। এই গানে নাগরিক জীবনের ব্যর্থতা স্পষ্ট – মধ্যবিত্তের দৈনন্দিন যুদ্ধে স্বপ্নগুলো হারিয়ে যায়, শুধু অপেক্ষা আর অভিমান বাকি থাকে।
এই অপেক্ষার চরম রূপ ফুটে ওঠে “মাসের প্রথম দিনটা”-য়, যেখানে চাকুরেজীবী মধ্যবিত্তের গল্পটা গানের মাধ্যমে উঠে আসে। বেতন পাওয়ার দিনের সেই উল্লাস, যা শুধু এক রাতের মুক্তি দেয়, কিন্তু তিরিশ দিনের যন্ত্রণার পর।
মাসের প্রথম দিনটা এই ধর্মতলার মোড়ে
লালচে আলো কালচে হয়ে যাওয়া অশোকা বারে
তিনটে বড় হুইস্কি, পেপসিতে নেড়ে চেড়ে
চেনা চেনা সেই চোখ, চীনে খাবার।
এই মাইনে পাওয়ার দিনটা, গড়ের মাঠটা ঘুরে
ফিরবো আজকে আমি, একা ট্যাকসিতে চড়ে।
…
এই রাতটা তোমার আমার। বেঁচে থাকি যদি তিরিশটা দিন
আবার আসবো ফিরে, নিয়ন আলো করে এলোমেলো
ধর্মতলার মোড়ে, হৃদয়ের সব যন্ত্রণা আমি দেব ঊজার করে
মাসের প্রথম দিনটায় আবার।
এখানে ধর্মতলার মোড় (কলকাতার হৃদয়স্থল) হয়ে ওঠে মধ্যবিত্ত চাকুরের অস্থায়ী মুক্তির জায়গা। বেতন পাওয়ার দিনে বারে গিয়ে হুইস্কি, চীনে খাবার, একা ট্যাক্সিতে ফেরা – সব মিলে একটা ছোট উৎসব, যা তিরিশ দিনের হাঁড়িকাঠের জবাইয়ের পর আসে। মাসের প্রথম দিনের অপেক্ষা, যা শুধু বিল পরিশোধ আর এক রাতের ভুলে যাওয়ার জন্য, কিন্তু পরের দিন আবার একই চক্র – এই এক গানেই অঞ্জন দত্ত এঁকেছেন চাকুরেজীবী মধ্যবিত্তের জীবনের গল্প। নাগরিক জীবনের এই চক্রাকার যন্ত্রণা, যেখানে মাইনে হয়ে ওঠে একমাত্র আশা, আর ধর্মতলার নিয়ন আলো যেন সেই যন্ত্রণার প্রতীক – এলোমেলো, কিন্তু অন্ধকার মুছে না।
অঞ্জন দত্তের গানের এই ধারা আরও গভীরভাবে ফুটে ওঠে “জেরেমির বেহালা” গানে, যেখানে শহরের পুরোনো স্মৃতি আর ভূতুড়ে একাকীত্ব মিশে যায়। গানের লিরিক্সে:
চুপি-চুপি রাত নেমে এলে পরে, ভাঙা জানলার শার্সিটা খুলে যায়
কালি-ঝুলি মাখা ঘরটায়, কে যেন আবার হেঁটে চলে খালি পায়
মাঝে মাঝে লোডশেডিংয়ের রাতে বেজে ওঠে জেরেমির বেহালা
পাড়াপড়শিরা সব্বাই জানে আসে যায় সেই কালো সাহেবের ভূত…
এখানে শহরের পুরোনো বাড়ি, লোডশেডিংয়ের অন্ধকার, ভূতের ছায়া – সব মিলে নাগরিক জীবনের একাকীত্বের ছবি আঁকে। মধ্যবিত্তের ব্যক্তিগত জীবনে ব্যর্থতা ফুটে ওঠে এই স্মৃতির ভূতে, পুরোনো কলকাতা যেন ফুরিয়ে যায় না, কিন্তু বর্তমানের যন্ত্রণায় তা শুধু ভূতের মতো ফিরে আসে, সান্ত্বনা দেয় না। বেহালার সুর যেন মধ্যবিত্তের নীরব কান্না – শহরের ভিড়ে হারানো স্বপ্নের প্রতিধ্বনি।
অন্যদিকে “কালো ম্যাম” (ম্যারি অ্যান)-এ অঞ্জন দত্ত প্রেমের মাধ্যমে সমাজের বর্ণবাদ এবং মধ্যবিত্তের মূল্যবোধের সংকট তুলে ধরেন, যেখানে ব্যক্তিগত ভালোবাসা ব্যর্থ হয় সমাজের চাপে।
কালো সাহেবের মেয়ে ইস্কুল পালিয়ে ধরতে তোমার দুটো হাত
তোমার বাবা ছিলো ইঞ্জিন ড্রাইভার, আমার বনেদি ব্যবসা
বংশের ইজ্জত রাখতে হলে বউ হতে হবে ফর্সা…
এই গানে নাগরিক জীবনের ব্যর্থতা ফুটে ওঠে প্রেমের সামাজিক বাধায়। মধ্যবিত্তের “ইজ্জত” আর বংশের মূল্যবোধ প্রেমকে ছিন্ন করে, যেখানে কালো-ফর্সার বিভেদ শহরের নিষ্ঠুরতাকে প্রতিফলিত করে। ব্যক্তির জীবনে এই ব্যর্থতা যেন একটা নীরব যুদ্ধ – প্রেম পাওয়া যায় না, শুধু স্মৃতি বাকি থাকে। আর “আমার জানালা”-য় অঞ্জন দত্ত ব্যক্তিগত দৃষ্টিভঙ্গি থেকে নাগরিক জীবনের সীমাবদ্ধতা আঁকেন, যেখানে মধ্যবিত্তের পৃথিবী যেন একটা ছোট জানালায় বন্দী।
আমার জানালা দিয়ে একটু খানি আকাশ দেখা যায়
একটু বর্ষা একটু গ্রীষ্ম একটু খানি বাতাস বয়
আমার জানালা দিয়ে আমার পৃথিবী
সেই পৃথিবীতে বিকেলের রং হেমন্তে হলুদ
সেই পৃথিবীতে পাশের বাড়ির কান্না শোনা যায়
পৃথিবীটা বড়ই ছোটো আমার জানালাই…
এখানে মধ্যবিত্তের জীবনের ব্যর্থতা ফুটে ওঠে এই সীমিত দৃষ্টিতে। শহরের বিশালতা সত্ত্বেও ব্যক্তির পৃথিবী ছোট, জানালার ফাঁকে আটকে – যেখানে পাশের কান্না শোনা যায়, কিন্তু নিজের যন্ত্রণা প্রকাশ করা যায় না। শহর যেন একটা কারাগার, যেখানে স্বপ্নগুলো জানালার বাইরে থেকে যায়।
“ববি রায়”-এ অঞ্জন দত্ত প্রেম এবং স্মৃতির মাধ্যমে ব্যর্থতার ছবি আঁকেন, যেখানে শহরের ভিড়ে হারানো সম্পর্কের যন্ত্রণা ফুটে ওঠে। এই গানে উচ্চাকাঙ্ক্ষার কাছে প্রেমের হেরে যাওয়ার বিষয়টি সবচেয়ে স্পষ্ট, যেখানে মধ্যবিত্তের অভাবগ্রস্ত প্রেমিকের ভালোবাসা হারায় ধনী “ববি রায়”-এর কাছে, টাকা-কড়ি, গাড়ি-বাড়ির লোভে।
আকাশের রং কালো হয়ে এলো বৃষ্টি নামবে এখনি জানি তবু
ছেঁড়া ছাতা নিয়ে ভিজে ভিজে আমি থাকবো দাঁড়িয়ে তোমার অপেক্ষায়
আরো একবার একই পথে চলে একই কথা বলে কাটবে সন্ধ্যেটা
তবু রাস্তা বদলে যেও না তুমি যেও না ফেলে আমায়
স্বপ্নের রঙ ফিকে হয়ে গেছে ভবিষ্যত আমার অনিশ্চিত
পেছনে আমার কানাগলি আর সামনে শুধুই গাঢ় অন্ধকার
গোলাপ কেনার সামর্থ্য নেই দেবার আছে শুধুই একটা গান
গানে গানে তাই করে যাই আমি তোমার কাছে একটাই আবদার
ববি রায়ের সাথে চলে যেও না, ছেড়ে যেও না ববি রায়ের কথায়
বয়ে যেও না, ফেলে আমায়
জানি টাকা কড়ি আর মারুতি গাড়ির প্রয়োজন আছে…
এই লাইনগুলোতে মধ্যবিত্তের ব্যক্তিগত জীবনে নাগরিকতার যন্ত্রণা ফুটে ওঠে স্মৃতির ডাকে। শহরের দৈনন্দিনে প্রেম হারিয়ে যায় উচ্চাকাঙ্ক্ষার (টাকা-কড়ি, গাড়ি) কাছে, শুধু গান আর অভাবের ছায়া বাকি থাকে। প্রেমিকের ছেঁড়া ছাতা, ফিকে স্বপ্ন, গোলাপ কেনার অসামর্থ্য – সব মিলে প্রেমের পরাজয়ের ছবি আঁকে, যেখানে উচ্চাকাঙ্ক্ষা এবং বস্তুগত লোভ প্রেমকে ছিনিয়ে নেয়, ব্যর্থতার একটা নীরব কান্না হিসেবে।
মধ্যবিত্ত যন্ত্রণার যে ছবি অঞ্জন দত্ত আঁকেন, সেটি কোনো আর্থিক সংকটের ছবি নয়। এটি নৈতিক এবং মানসিক ক্লান্তির ছবি। মধ্যবিত্ত মানুষ জানে কী চাওয়া উচিত নয়, কী বলা উচিত নয়, কোথায় থামা উচিত। এই আত্মনিয়ন্ত্রণই একসময় যন্ত্রণায় পরিণত হয়। অঞ্জন দত্ত এই যন্ত্রণাকে খুব সরলভাবে তুলে ধরেন—কোনো অভিযোগ ছাড়া। তার গানে রাজনীতি সরাসরি উপস্থিত না থাকলেও, রাজনৈতিক বাস্তবতার ফল স্পষ্টভাবে দেখা যায়। সময়ের অভাব, কাজের চাপ, জীবনের অনিশ্চয়তা – এসবই সামাজিক কাঠামোর অংশ। অঞ্জন দত্ত সেই কাঠামোর নাম নেন না, কিন্তু তার প্রভাব দেখান।
অঞ্জন দত্তের গানে কোনো চড়া বিপ্লব নেই, কোনো উচ্চস্বরে প্রতিবাদ নেই। আছে শুধু একটা নরম, গভীর, কাব্যিক যন্ত্রণা – যা শ্রোতার হৃদয়ে দীর্ঘস্থায়ী দাগ কেটে যায়। তাঁর সুরে শহরের একাকী মানুষ নিজেকে খুঁজে পায়, প্রেমের না-পাওয়ায় নিজের ছায়া দেখে, মধ্যবিত্তের ছোট ছোট যুদ্ধে নিজের প্রতিচ্ছবি দেখে। আর সেই যন্ত্রণার মধ্যেই লুকিয়ে থাকে এক অদ্ভুত মুক্তি, কারণ গান গাইতে গাইতে যেন সব যন্ত্রণা একটু হালকা হয়, একটু সহ্যযোগ্য হয়।
আজও যখন নগরের যান্ত্রিক কোলাহলে একা হাঁটি, অঞ্জন দত্তের গান কানে বাজে নীরব যন্ত্রণার আর্তনাদ হয়ে। নগরের এই নিঃশব্দ ছায়ায়, প্রেমের অধরা স্পর্শে, মধ্যবিত্তের নীরব কান্নায় – তাঁর গান আমাকে ফিসফিস করে বলে ‘তুমি একা নও, এই যন্ত্রণা অনেকের’। আর এই যন্ত্রণাতেই লুকিয়ে আছে জীবনের সবচেয়ে সত্যি, সবচেয়ে মানবিক সুর।
আর এই কারণেই অঞ্জন দত্ত আজও প্রাসঙ্গিক। তার গান তাৎক্ষণিক আবেগ তৈরি করে না। তার গান শুনে কেউ হঠাৎ বদলে যায় না। কিন্তু তার গান মানুষের ভেতরে একটা স্থায়ী অস্বস্তি রেখে যায় – নিজের জীবন, নিজের সম্পর্ক, নিজের সিদ্ধান্ত নিয়ে ভাবার অস্বস্তি। অঞ্জন দত্ত কোনো সমাধান দেন না। তিনি কোনো দিকনির্দেশনা দেন না। সরল শব্দে আর মায়াবী সুরে তিনি শুধু বলেন – এই জীবনটা এমনই। অসম্পূর্ণ, ক্লান্ত, তবু চলমান। আর এই বাস্তবতাকে স্বীকার করাটাই তার গানের সবচেয়ে বড় সত্য।
অঞ্জন দত্ত তাই কোনো আন্দোলনের কণ্ঠ নন, জীবনকে ভিন্নভাবে দেখতে বাধ্য করা কোন দার্শনিক নন। তিনি শহরের নীরব মানুষের প্রতিনিধি। যাদের জীবন নাটকীয় নয়, কিন্তু গভীর। যাদের গল্প বলা হয় না, কিন্তু যাদের দিয়েই শহরটা চলে।
(তথ্যসূত্র: অঞ্জন দত্তের অ্যালবাম ‘পুরোনো গিটার’, ‘শুনতে কি চাও?’, ‘সেরা দশ’, ‘নগর বাউল’ ইত্যাদি থেকে লিরিক্স সংগৃহীত। লিরিক্সের উৎস: স্পটিফাই, জিওসাভন, এবং অন্যান্য অনলাইন সূত্র।)
আরো পড়ুনঃ নচিকেতা ও রাজনীতির দর্শন ।। দর্শনের ফেরিওয়ালা কবির সুমন


Discussion
Trackbacks/Pingbacks
Pingback: নচিকেতা ও রাজনীতির দর্শন: গানের ভেতরে লুকিয়ে থাকা এক অসন্তুষ্ট নাগরিক চিন্তক | iammoulude - February 10, 2026
Pingback: কবির সুমনঃ ঠাস বুনোটের বৃত্তে বন্ধী জীবনে একজন গানের সেতুকার এবং দর্শনের ফেরিওয়ালা | iammoulude - February 10, 2026