you're reading...
Random Thoughts

৯০ দশকের ভাগ্যবান প্রজন্ম: সময়ের পট পরিবর্তন ও বিবর্তনের রাজসাক্ষী

নব্বই দশকের প্রজন্ম নিয়ে অনেক কথা অনেক গল্প এখনও চায়ের আড্ডায় প্রজন্ম প্রতিনিধিদের নস্টালজিক করে তোলে। তবে নব্বই দশকের প্রজন্মকে সংজ্ঞায়িত করার সুনির্দিষ্ট কোন রেখা মনে হয় কোন আলোচনায় নেই। নব্বই দশকের প্রজন্ম বলতে আমরা কাকে বুঝি? নব্বইয়ের দশকের জন্ম নেয়া না আশির দশকে জন্ম এবং নব্বইয়ের দশকে বেড়ে ওঠা? তবে মোটামুটিভাবে বলা যায় বর্তমান সময়ে যাদের বয়স ৩০শের কোটায় তারা কোন না কোন ভাবে নব্বইয়ের সাথে সম্পৃক্ত। এটা আসলে কোন প্রজন্ম যুদ্ধ নয়। এটা শব্দ আর বাক্যের আদলে নিজের ফেলে আসা দিনের ছবি আঁকা! ৯০ দশকের প্রজন্ম হিসেবে নিজেদের ভাগ্যবান মনে করার মূল প্রেক্ষাপট তুলে ধরার প্রয়াসে এই লেখা। সে প্রেক্ষাপটকে কয়েকটি ভিন্ন অবয়বে আলোচনা করছি এই লেখায়।

আমরা নব্বইয়ের প্রজন্ম এমন এক সময়ে জন্মেছিলাম – যখন সময়ের গতি ধীর ছিল, অথচ জীবন ছিল ভীষণ গভীর। ৯০ দশকের মানুষ হওয়া মানে শুধু একটা জন্মসাল নয়, এটা একটা অভিজ্ঞতা, একটা অনুভব, একটা সম্পূর্ণ জীবনদর্শন। তখন সকাল মানে ছিল আজানের ধ্বনি, মোরগের ডাক আর নামাজ পরে পড়তে বসার এক অবিরাম যুদ্ধ। সকালবেলা ঘুম ভাঙতো না অ্যালার্মে, ভাঙতো মায়ের ডাকে! জানালা খুললেই ঠান্ডা হাওয়ার সাথে ভেসে আসতো বাড়ির গরুর গোয়ালের গন্ধ! সকালের মক্তব শেষে বাড়ি এসে স্কুলের যাওয়ার প্রস্তুতি ছিলো বিরক্তের কিন্তু নিয়মিত এক বাস্তবতা।

আমাদের শৈশব ছিল ধুলো-মাটিতে গড়ানো। বিকেলের মাঠ, গলির ক্রিকেট, কঞ্চি খেলা, ডাংগুলি, মার্বেল, গোল্লাছুট – এগুলোই ছিলো আমাদের ভার্চুয়াল অভয়রান্য। হার-জিতের পরও বন্ধুত্ব ভাঙত না, বরং সন্ধ্যার পর সবাই একসাথে বাড়ি ফিরত, যেন একটা অদৃশ্য চুক্তি ছিল – বন্ধুত্ব মাঠেই শেষ, জীবন আবার একসাথে। আজ যখন স্মার্টফোনের আলোয় চোখ জ্বলে, নেটফ্লিক্সের স্ক্রিনে আঙুল স্ক্রল করে, তখন হঠাৎ করেই মনে পড়ে যায় ফেলে আসা সেই সোনালী সময়ের কথা। আমরা সেই শেষ প্রজন্ম ছিলাম যারা আসলেই “বাইরে খেলতে যাও” কথাটা শুনতে শুনতে বড় হয়েছি। আমরা ছিলাম অ্যানালগ যুগের শেষ সন্তান, আর ডিজিটাল যুগের প্রথম দর্শক। আর ঠিক এই দুই যুগের মাঝখানে দাঁড়িয়ে আমরা যেন পেয়ে গিয়েছিলাম জীবনের সবচেয়ে মিষ্টি, সবচেয়ে নির্মল একটা সময়।

আমরা সেই প্রজন্ম, যারা জন্ম নিয়েছি একটা যুগান্তকারী সময়ের মাঝামাঝি – যেখানে পুরনো সবকিছু ধীরে ধীরে বিদায় নিচ্ছিল, আর নতুন সময় দরজায় কড়া নাড়ছিল। ৯০-এর দশকে বড় হয়ে উঠেছি আমরা, আর সেই বড় হওয়ার পথে সাক্ষী হয়েছি অসংখ্য বিবর্তনের। যেন একটা ব্রিজের উপর দাঁড়িয়ে, আমরা দেখেছি নদীর দুই পাড় – একদিকে অ্যানালগের সরলতা, অন্যদিকে ডিজিটালের ঝলমলে আলো। কখনো সেই পরিবর্তনগুলো আমাদের হাসিয়েছে, কখনো অবাক করেছে, আর কখনো একটা মিষ্টি নস্টালজিয়ায় ভরিয়ে দিয়েছে। আজ যখন সবকিছু হাতের মুঠোয়, তখন মনে পড়ে যায় সেই দিনগুলো, যখন অপেক্ষার মধ্যেই ছিল আনন্দের সারাংশ।

বর্তমান আধুনিক প্রজন্মের সাথে আমাদের প্রজন্মের সবচেয়ে বড় পার্থক্য হচ্ছে আমাদের বেড়ে উঠার মাঝে। যদিও গবেষণা প্রলুব্ধ নয়, তবুও ৯০ দশকের প্রজন্মই সম্ভবত প্রকৃতির কোলে বেড়ে উঠা সর্বশেষ প্রজন্ম। মাঠির কাছাকাছি এবং মাঠি আর পানির স্পর্শে কাটানো দুরন্ত সেই সময়গুলো কোন ফ্রেমে আবদ্ধ করা হয়নি ঠিকই কিন্তু মনের ফ্রেমে সেই সময়গুলো এখনও অম্লান। গ্রাম্য মেলায় কেনা মিষ্টি খই, তাল পাখা, বাঁশি কিংবা একটাকা দামের চকলেটের সাথে শৈশবের সেই আবেগ! অগ্রাহায়ন মাসে ধান কাটা হয়ে গেলে, ন্যাড়া কেটে শীত কাটাতে আগুন পোহানো, স্কুল পালিয়ে মোস্তফা খেলা কিংবা তাল পড়ার শব্দে দীঘির পানিতে ঝাঁপ। স্কুলের পড়ার বইয়ের মাঝে রেখে লিটল ম্যাগাজিন, তিন গোয়েন্দা বা মাসুদ রানা পড়া! আজকের হাতের মুঠোয় সবকিছু থাকা স্বত্বেও কেনো যেনো মনে হয় কিছু একটা নেই। এই সব থাকার মাঝে না থাকার এই অনুভূতি বারবার ফিরিয়ে নিয়ে যায় ফেলা আসা সময়ের সৃতির বালুচরে।

এই দশকের প্রজন্মের কাছে বিনোদনের সবচেয়ে বড় মাধ্যম ছিলো নিজেদের মধ্যে দল বেঁধে উম্মাদনা আর দুরন্তপনা। আর্থিক সীমাবদ্ধতার কারনে ক্রিকেট ফুটবল কমই খেলা হতো, তবে লাটিম, দাঁড়াকটি (ডাংগুলি), বন্দি (বাঘবন্দি), বৈঁচি, সাতচিক (সাতচাড়ারখেলা), কুতকুত, কিংবা দল বেঁধে ঘুড়ি উড়ানো। তবে এই প্রজন্মের জন্য বিনোদনের সবচেয়ে নস্টালজিক দিনের নাম শুক্রবার! নামাজে যাওয়ার আগে বিটিভি’র প্রথম অধিবেশন বন্ধের সময় বিকেলের অনুষ্ঠানসূচীতে সিনেমার নাম এবং নায়ক-নায়িকার নাম শুনার চেষ্টা। পছন্দের নায়ক হলে পুরোটা সময়ের উত্তেজনা আর বিকেল তিনটার সেই অধির অপেক্ষা। এছাড়াও রাতের আলিফ-লায়লা, দ্যা নিউ এডভেঞ্চার অব সিন্দাবাদ, রবিনহুড, ম্যাকগাইবার, সুপারম্যান, ব্যাটম্যান ইত্যাদি। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর বাড়ির সবাইকে জানান দিয়ে স্কুলের পড়া! স্কুলের যাওয়ার জন্য বাবার দেয়া হিসেব করা গাড়ি ভাড়ার বেশী ১/২ টাকা কারো কাছ থেকে পওয়া মানে ছিলো বিশ্বজয়ের মতো ব্যাপার। আজকের হাজার হাজার টাকাও সেই টাকার অনুভূতির কাছে ম্লান।

ঈদ মানে ছিল স্বর্গ। নতুন জামা, পায়জামা, জুতো। সকালে ঈদগাহ থেকে ফিরে সেমাই-পায়েস খাওয়া, তারপর সালামি সংগ্রহের পালা। পকেট ভরে যেত দুই টাকা, পাঁচ টাকার নোটে। সেই টাকায় মেলা থেকে চিনির পুতুল, বেলুন, টিনের পিস্তল, আর লাট্টু কেনা। স্কুল শেষে বাড়ি ফেরার গাড়ি ধরার পাশাপাশি ছিলো বিকেলে বন্ধুদের সাথে মেলায় ঘোরা, স্কুলের মাঠে আয়োজিত ‘ষাঁড়ের লড়াই’ কিংবা বৈশাখী মেলার ‘ঘোড়দৌড়’ খেলা। আমরা সেই প্রজন্ম যারা মোবাইল ছাড়াই বন্ধুর বাড়ি গিয়ে ডাক দিতাম। আজ সবকিছু হাতের মুঠোয়। কিন্তু সেই সব থাকার মাঝেও যেন কিছু একটা নেই – সেই অপেক্ষার মজা, সেই অজানা আনন্দ, সেই নির্ভেজাল খেলার সময়।

নব্বই দশকের প্রজন্ম সবচেয়ে বড় বিবর্তনটা হয়তো দেখেছে যোগাযোগে। আমরা সেই প্রজন্ম যারা ল্যান্ডফোনে কয়েন ফেলে কথা বলতে শিখেছে। দোকানের সেই লাল টেলিফোন বুথ, যেখানে দাঁড়িয়ে মিনিট গুনতাম আর ভয় পেতাম যে কয়েন শেষ হয়ে যাবে! তারপর এল বাটন ফোন – সেই সিমেন্স ৫০ থেকে নোকিয়া ১১০০, সেই স্নেক গেম আর টর্চ লাইট, যা আমাদের প্রথম ‘পকেট ডিভাইস’ অভিজ্ঞতা। আর আজ? স্মার্টফোনের যুগ, যেখানে সারা বিশ্ব একটা স্ক্রিনে। কিন্তু সেই প্রথম ফোন কলের উত্তেজনা, যখন লাইন ব্যস্ত থাকতো আর আমরা অপেক্ষা করতাম – সেটা কোথায় হারিয়ে গেল? আমরা সাক্ষী হয়েছি এই যাত্রার, যাত্রা যা দূরত্বকে ছোট করে দিয়েছে, কিন্তু কখনো কখনো মানুষকে আরও দূরে সরিয়ে দিয়েছে।

শিক্ষার জগতেও আমরা দেখেছি অদ্ভুত রূপান্তর। হাতে লিখা অ্যাসাইনমেন্ট দিয়ে শুরু – কলমের কালি আঙুলে লেগে যেত, খাতার পাতায় দাগ পড়তো, আর স্যারদের লাল কালির মার্কিংয়ে হৃদয় কাঁপতো। তারপর এল কম্পিউটার যুগ – ইন্টারনেট ক্যাফে গিয়ে সার্চ করে টাইপ করা, প্রিন্টারের শব্দে উত্তেজনা। আর আজ? AI-এর যুগ, যেখানে একটা প্রম্পট দিলেই অ্যাসাইনমেন্ট তৈরি। আমরা সেই প্রজন্ম যারা ব্ল্যাকবোর্ডের ধুলো থেকে হোয়াইটবোর্ডের মার্কার হয়ে ডিজিটাল ক্লাসরুম দেখেছি। সেই পরিবর্তন আমাদের শিখিয়েছে যে জ্ঞানের দরজা খোলা হচ্ছে প্রতিদিন, কিন্তু সেই হাতে লেখার অনুভূতি, সেই নতুন খাতার গন্ধ – সেই চিরকালের নস্টালজিয়া এখনো আমাদের কাছে অম্লান।

শিক্ষা ব্যবস্থায় এই প্রজন্ম আরো একটি বিবর্তনের নীরব সাক্ষী হয়েছে। আমারা মাধ্যমিক এবং উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষায় ডিভিশন (মার্ক্স ভিত্তিক ফলাফল) থেকে গ্রেডিং ব্যবস্থায় রুপান্তর দেখেছি। বোর্ডের এই পরীক্ষাগুলোর সময় এবং রেজাল্ট আসা পর্যন্ত সময়ের স্মৃতি এখনো সতেজ। শুধু ফলাফল নয়, শিক্ষা এবং শিক্ষার ধরনেও আমরা দেখেছি বিরাট পরিবর্তন। উচ্চ মাধ্যমিক শেষে সরকারী বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো উচ্চ শিক্ষার সবচেয়ে বড় মাধ্যম। বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ছিলো পুরপুরি সীমিত একটা গোষ্টির জন্য। আমাদের সময়ে বেড়ে উঠায় মূলত দুটি ধারার সামাজিক মর্যাদা ছিলো – ইঞ্জিনিয়ার এবং ডাক্তার। প্রাথমিক বা মাধ্যমিকে অংক এবং বিজ্ঞানে ভালো ফলাফল মানেই ছিলো বাবা-মা’র তাকে ইঞ্জিনিয়ার বা ডাক্তার বানানোর স্বপ্ন। অতচ এখন, সবার কাছে জীবনের সিদ্ধান্ত গ্রহনের রাস্তা অনেক উম্মুক্ত।

রাজনীতির মঞ্চেও আমরা ছিলাম সাক্ষী। ৯০-এর গণআন্দোলন, এরশাদের স্বৈরশাসনের পতন, গণতন্ত্রের পুনরুদ্ধার – আমরা ছোটবেলায় শুনেছি রাস্তায় স্লোগান, দেখেছি হরতালের দিনগুলো যখন স্কুল বন্ধ থাকতো আর আমরা বাড়িতে বসে রেডিও শুনতাম। তারপর ফ্যাসিজমের ছায়া, উত্থান আর পতন – বাংলাদেশের রাজনৈতিক যাত্রা যেন একটা ঝড়ো নদী, যার মাঝে আমরা ভেসে গিয়েছি। আজকের যুগে সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রতিবাদ, কিন্তু সেই রাস্তার আন্দোলনের আগুন, সেই একতার অনুভূতি – আমরা সাক্ষী হয়েছি সেই বিবর্তনের, যা আমাদের শিখিয়েছে যে স্বাধীনতা একটা চলমান যুদ্ধ।খেলাধুলার জগতে তো বিপ্লবই হয়েছে।

শুধু তাই নয়, সন্দেহাতীতভাবে ৯০ দশকের প্রজন্ম বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক এবং রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সাক্ষী। স্বাধীনতাউত্তর বাংলাদেশের রাজনীতিতে সরাসরি হত্যা করে ক্ষমতা দখলের ইতি দেখেছে এই প্রজন্ম। তবে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ কর্তাব্যাক্তিদের হত্যার এই ধারা বন্ধের পাশাপাশি এই সময়ে বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবির্ভাব হয়েছে গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্র। এই গণতান্ত্রিক রাজতন্ত্রের হাত ধরে সন্ত্রাস আর রাজনীতির আমোঘ সম্পর্ক পেয়েছে প্রাতিষ্টানিক স্বীকৃতি। ধীরে ধীরে শিল্পায়ন আর অবকাঠামো উন্নয়েনের সাজানো নাটকের সাথে শিক্ষাও যুক্ত হয়েছে নির্বাচনী প্রচারণায়। স্কুল, কলেজ আর বিশ্ববিদ্যালয়ের সংখ্যা বেড়েছে ঠিকই কিন্তু তার বেশীরভাগই একটি নির্দিষ্ট গোষ্টিকে পৃষ্টপোষকতার জন্য। এইসব নব্য প্রতিষ্টিত শিক্ষালয়গুলো স্বনির্ভর মানুষ তৈরি না করে গড়ে তুলছে কেরানি হওয়ার মানসিকতা। এইসব সুবিশাল পরিপ্রেক্ষিত প্রতক্ষ্য এবং পরোক্ষ্য ভাবে প্রভাব রেখেছে এই প্রজন্মের উপর। বর্তমানে বাংলাদেশে মধ্যবিত্তের এই ব্যাপক বিস্তারের পিছনে এই প্রজন্মের বেড়ে উঠার ক্ষেত্র অন্যতম প্রভাব রেখেছে।

দেশীয় খেলাধুলায়ও এই সময়ে লেগেছিলো বিবর্তনের হাওয়া। বাংলাদেশে ফুটবলের রাজত্ব থেকে ক্রিকেটের উত্থান! মোহাম্মদান-আবাহনীর ম্যাচে স্টেডিয়াম ভর্তি দর্শক, তর্কযুদ্ধ থেকে হাতাহাতি ছিলো নিয়মত, কিন্তু তারপর এল ক্রিকেটের যুগ। নিরানব্বইয়ের বিশ্বকাপ, বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট স্ট্যাটাসের আনন্দ থেকে পঞ্চ পাণ্ডবের হাত ধরে বিশ্ব মঞ্চে বাংলাদেশ ক্রিকেটের সাফল্য গাঁথা! ফুটবলে ম্যারাডোনার যুগ থেকে মেসির যুগান্তর – চার বছরে একবার ফুটবল বিশ্বকাপ উম্মাদনা থেকে আজকের চ্যাম্পিয়নস লিগের লাইভ স্ট্রিম। আমরা সাক্ষী হয়েছি খেলার বিবর্তনের, যা আমাদের শিখিয়েছে যে আনন্দের রূপ বদলায়, কিন্তু উত্তেজনা অটুট থাকে।

বিনোদনের দুনিয়াও আমাদের চোখের সামনে পাল্টেছে। শুক্রবার বিটিভিতে সাপ্তাহিক সিনেমা দেখা আর ভিসিআর/ভিডিও ক্যাসেট ভাড়া করে বাড়িতে সিনেমা এখন যেনো কোন পৌরনিক গল্পগাথা। আজ? OTT প্ল্যাটফর্মের উত্থান – নেটফ্লিক্স, অ্যামাজন প্রাইম কিংবা দেশীয় চরকি, যেখানে সিনেমা এবং সিরিজ এক ক্লিকের দূরত্ব। ক্যাসেট প্লেয়ার থেকে ওয়াকম্যান হয়ে স্পটিফাই – পছন্দের গানের ক্যাসেট জমানো থেকে আজকের প্লেলিস্ট। সেই বিবর্তন আমাদের দিয়েছে অসীম বিকল্প, কিন্তু সেই শুক্রবারের অপেক্ষার মজা, সেই পরিবারের একসাথে বসে দেখার অনুভূতি – এমন এক নস্টালজিয়া যা ভাবনার নতুন দুনিয়া।

৯০-এর দশককে অনেকে বাংলাদেশের সঙ্গীতের সবচেয়ে উর্বর সময় বলে। আগের দশকের রুনা লায়লা, সাবিনা ইয়াসমিন, আন্দ্রু কিশোরের পাশাপাশি এল নতুন ধারা – রক, পপ, ব্যান্ড সংস্কৃতি। Warfaze, Love Runs Blind (LRB), Rockstrata—এই ব্যান্ডগুলো স্টেডিয়াম ভরিয়ে দিত। Guns N’ Roses, Pink Floyd-এর প্রভাবে লম্বা চুল, চেইন, বুট পরা যুবকদের ভিড়। ‘আকাশের নিচে’, ‘অনুভূতি’ থেকে শুরু করে বাংলা রকের জন্ম। কিন্তু একই সাথে বলিউডের গান ঢুকে পড়লে, একটা হাইব্রিড সঙ্গীত সংস্কৃতি তৈরি হল, যেখানে পশ্চিমা রক আর ভারতীয় পপ মিশে গেল। এই দশকের শেষে রক সংস্কৃতি যেন তার চূড়ান্ত উচ্চতায় পৌঁছাল, কিন্তু পরবর্তী দশকে ধীরে ধীরে বলিউডের ছায়ায় পড়তে শুরু করল।

এই সময়ের, আমার মতে সবচেয়ে শক্তিশালী সম্পর্ক ছিলো ছাত্র এবং শিক্ষকের মধ্যকার সম্পর্ক। এই দশকে একজন ছাত্রের জীবন দর্শনে একজন শিক্ষকের প্রভাব ছিলো সবচেয়ে বেশী। সেই সম্পর্ক টাকার পরিমাণ দিয়ে বিচার হতোনা, বিচার হতো শ্রদ্ধাবোধ দিয়ে। প্রাইমারী স্কুলের একজন শিক্ষক রাতের বেলায় ঘরে ঘরে গিয়ে তার ছাত্র-ছাত্রীদের পড়া লেখার খোঁজ খবর নিতেন। স্কুলের সবচেয়ে ডানপিঠে ছেলেটি একজন স্যারের নাম শুনে থরথর করে কাপার উদাহরণ মনে হয় এখন পাওয়া যাবেনা। ছাত্রছাত্রীদের কাছে একসময়ের সবচেয়ে বড় আতংককে পরে দেখে বিনম্র শ্রদ্ধায় মাথা নথ হয়ে যাওয়ার গল্প এখনকার প্রতিশোধ পরায়ণ প্রজন্মের কাছে রূপকথার গল্পের মতোই শুনাবে।

আরো অনেক বিবর্তনের সাক্ষী আমরা। চিঠি লেখা থেকে ইমেইল হয়ে সোশ্যাল মিডিয়া! প্রিয়জনের চিঠির অপেক্ষা থেকে ইনস্ট্যান্ট মেসেজ। ডায়াল-আপ ইন্টারনেটের সেই ‘ডিং-ডং’ শব্দ থেকে ৫জি-এর স্পিড। সাইকেল চালানো থেকে মোটরবাইক হয়ে ইলেকট্রিক কারের যুগ। বইয়ের লাইব্রেরি থেকে ই-বুকস।

আমরা বাবা-মায়ের কড়া শাসন পেয়েছি, আবার নিঃশর্ত ভালোবাসাও পেয়েছি। শিখেছি সম্মান করতে, বড়দের সামনে চুপ থাকতে, ছোটদের আগলে রাখতে। আজকের দ্রুত বদলে যাওয়া দুনিয়ায় দাঁড়িয়ে আমরা দুই সময়ের সেতু – এক পায়ে শেকড়, আরেক পায়ে ভবিষ্যৎ। হয়তো আমরা নিখুঁত ছিলাম না। কিন্তু আমরা ভাগ্যবান ছিলাম। কারণ আমরা দেখেছি জীবনকে আসল রঙে। আমরা দেখেছি একটা সময় যখন মানুষ মানুষের সাথে বেশি থাকতো, স্ক্রিনের সাথে নয়। আমরা ভাগ্যবান ছিলাম, কারণ আমরা দেখেছি বিশ্বকে বদলাতে। সেই বদলের মাঝে আমরা হারিয়েছি কিছু, পেয়েছি অনেক।

এই দশকের স্বকীয়তা এবং এই প্রজন্মের বেড়ে উঠার প্রেক্ষাপট নিয়ে বলার অনেক কিছুই আছে। আমাদের পরের প্রজন্মেরও কিছু স্বকিয়তা আছে এতে কোন সন্দেহ নেই। কিছু আমাদের প্রজন্মই সম্ভবত বাংলাদেশের সামগ্রিক পট পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় সাক্ষী। এই দশকে বাংলাদেশের সব ক্ষেত্রেই লেগেছে পরিবর্তনের ছোয়া, তাই এই প্রজন্ম আছে সমসাময়িক দুই সময়ের সাক্ষী হয়ে। জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা – প্রাথমিক শিক্ষায় ভর্তি থেকে শুরু করে জীবনের শেষদিন পর্যন্ত মানুষ লড়াই করে যাচ্ছে কোন কোন প্রতিযোগিতা জয়ের নেশায়। এই বিশাল পরিপ্রেক্ষিত এই প্রজন্মকে করেছে অন্য প্রজন্ম থেকে আলাদা এবং স্বকীয়। এই উত্তরাধুনিক সমাজের মধ্যবয়সী এই আমি একান্তে-নির্জনে এখনও অনুভব করি সেই ফেলে আসা সময়ের অভাব, নিজেকে ভাগ্যবান মনে করি এই প্রজন্মের একজন প্রতিনিধি হিসেবে।

এখন যখন মন খারাপ হয়, চোখ বন্ধ করি আর দেখি – একটা ছেলে/মেয়ে ল্যান্ডফোন বুথে দাঁড়িয়ে কয়েন ফেলছে, মাঠে ক্রিকেট খেলছে, শুক্রবার টিভির সামনে বসে অপেক্ষা করছে। সে আমি। সে আমরা। সেই ৯০-এর প্রজন্ম, বিবর্তনের সাক্ষী, নস্টালজিয়ার ধারক। আজ যখন পেছনে তাকাই, বুঝি – আমাদের শৈশব ছিল একটা উপহার। মোড়ক খুলতে দেরি হয়েছিল, কিন্তু ভেতরের জিনিসটা ছিল অমূল্য।

Unknown's avatar

About Md. Moulude Hossain

FinTech | Digital Payment | Product Strategy | Product Management | EMV | Business Development

Discussion

No comments yet.

Leave a comment

upay-GP Offers

Blog Stats

  • 120,182 hits

Archives

upay bonus

Recent Post