
প্রাচীন চীনের ওয়ারিং স্টেটস পিরিয়ডে (খ্রিস্টপূর্ব ৪৭৫-২২১) রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং যুদ্ধের প্রেক্ষিতে বিভিন্ন দার্শনিক ধারা উদ্ভূত হয়েছে। এর মধ্যে হান ফেইজির লেগালিজম (আইনবাদ), কনফুসিয়ানিজম (নৈতিকতাবাদ) এবং তাওইজম (প্রাকৃতিকতাবাদ) অন্যতম। এই দর্শনগুলোতে রাষ্ট্র শাসনের ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি প্রস্তাব করা হয়েছে। এরমধ্যে লেগালিজম কঠোর নিয়ন্ত্রণ, কনফুসিয়ানিজম নৈতিক উদাহরণ এবং তাওইজম প্রাকৃতিক সামঞ্জস্যকে প্রাধান্য দিয়েছে। চীনের কিন এবং হান রাজবংশে এগুলোর প্রভাব দেখা যায়, যা রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করেছে। এই দার্শনিক প্রস্তাবগুলোকে বাংলাদেশের প্রেক্ষিত আলোচনার আগে, চলুন এগুলোর বিস্তারিত দেখে নেয়া যাক।
হান ফেইজির লেগালিজম
প্রাচীন চীনের দার্শনিক হান ফেইজি (খ্রিস্টপূর্ব ২৮০-২৩৩) লেগালিজম (ফাজিয়া বা আইনবাদ) নামক একটি শক্তিশালী রাষ্ট্রতাত্ত্বিক ধারণার প্রধান প্রচারক। তার দর্শন রাষ্ট্রকে একটি যন্ত্রের মতো ব্যাখা করে, যেখানে কেন্দ্রীয় শাসকের ক্ষমতা, কঠোর আইন এবং কৌশলগত নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে সমাজকে স্থিতিশীল করা যায়। হান ফেইজির বই হান ফেইজিতে তিনি শাং য়াং, শেন বুহাই এবং শেন দাও-এর ধারণাগুলোকে সংশ্লেষিত করেছেন, যা চীনের কিন রাজবংশের ভিত্তি গড়ে তুলেছিল।
হান ফেইজির রাষ্ট্র ব্যবস্থার মূল ধারণাহান ফেইজির লেগালিজম মূলত তিনটি স্তম্ভের উপর দাঁড়িয়ে: ফা (আইন), শু (কৌশল) এবং শি (ক্ষমতা)। এগুলো একসাথে রাষ্ট্রকে একটি অটোক্র্যাটিক (স্বৈরাচারী) কিন্তু কার্যকরী ব্যবস্থায় পরিণত করে।
১। ফা (আইন): কঠোর এবং নিরপেক্ষ নিয়মের শাসন
হান ফেইজি বিশ্বাস করতেন যে মানুষের স্বভাব স্বার্থপর এবং লোভী। তাই “হৃদয় জয়” করার পরিবর্তে, রাষ্ট্রকে কঠোর আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। আইন সকলের জন্য সমান হবে – রাজা থেকে সাধারণ প্রজা পর্যন্ত। এতে পুরস্কার এবং শাস্তির ব্যবস্থা থাকবে – ভালো কাজের জন্য পুরস্কার, খারাপের জন্য কঠোর শাস্তি। উদাহরণস্বরূপ, তিনি বলেন, “মানুষ কোনো নৈতিকতার জন্য নয়, বরং স্বার্থের জন্য কাজ করে।” এই ধারণা অতীতের সেজ-কিংদের (প্রাচীন রাজাদের) আদর্শকে প্রত্যাখ্যান করে, কারণ অতীতের মডেল বর্তমানের জন্য অপ্রাসঙ্গিক। পরিবর্তে, আইনকে অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক পরিস্থিতির সাথে অভিযোজিত করতে হবে।
২। শু (কৌশল): শাসকের গোপন কৌশল এবং নিয়ন্ত্রণ
শাসককে তার মন্ত্রীদের উপর নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে গোপন কৌশলের মাধ্যমে। হান ফেইজি বলেন, মন্ত্রীরা স্বার্থপর, তাই শাসক তাদের ক্ষমতা বণ্টন করবে না; বরং তাদের কর্মক্ষমতা যাচাই করে পুরস্কার-শাস্তি দেবে। এতে মেরিটোক্রেসি (যোগ্যতা-ভিত্তিক) ব্যবস্থা আসে, কিন্তু এটি নিরপেক্ষ মানদণ্ডের উপর ভিত্তি করে, নৈতিকতার উপর নয়। তিনি কনফুসিয়ানিজম এবং মোয়িজমকে আক্রমণ করেন কারণ এগুলো অতীতমুখী এবং অবাস্তব।
৩। শি (ক্ষমতা): শাসকের সার্বভৌমত্ব
শাসকের ক্ষমতা অটুট এবং অবিচল। হান ফেইজি বলেন, “প্রজা শাসককে অনুসরণ করে কারণ তার ক্ষমতা আছে, নৈতিকতার জন্য নয়।” এতে রাষ্ট্র একটি যন্ত্রের মতো চলে, যেখানে ব্যক্তিগত সম্পর্ক বা নৈতিকতা নয়, কেন্দ্রীয় ক্ষমতা সবকিছু নিয়ন্ত্রণ করে। এই ধারণা চীনের কিন রাজবংশকে শক্তিশালী করেছিল, কিন্তু এটি স্বৈরাচারের দিকে নিয়ে যায়।
হান ফেইজির দর্শন মানুষকে “দুষ্ট” হিসেবে দেখে (জুনজির মতো), তাই আইন দিয়ে তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। এটি ডাওইজম থেকে অনুপ্রাণিত, কিন্তু বাস্তববাদী।
কনফুসিয়ানিজম
হান ফেইজির রাষ্ট্র ব্যবস্থা (লেগালিজম) এবং কনফুসিয়ানিজমের মধ্যে তুলনা একটি ক্লাসিক দার্শনিক বিতর্ক, যা প্রাচীন চীনের ওয়ারিং স্টেটস পিরিয়ডে (খ্রিস্টপূর্ব ৪৭৫-২২১) উদ্ভূত হয়েছে। হান ফেইজি নিজেই কনফুসিয়ানিজমের প্রতি তীব্র সমালোচনা করেছেন এবং লেগালিজমকে তার বিকল্প হিসেবে উপস্থাপন করেছেন। নিচে এই ধারণার বিস্তারিত আলোচনা থাকছে।
কনফুসিয়ানিজম মানুষকে স্বাভাবিকভাবে ভালো মনে করে। কনফুসিয়াস বলেন, শিক্ষা, আচার-অনুষ্ঠান এবং নৈতিক উদাহরণ দিয়ে মানুষকে উন্নত করা যায়। শাসক যদি নিজে ren (দয়া) ও li (আচার) অনুসরণ করেন, প্রজা স্বাভাবিকভাবে অনুসরণ করবে। তবে হান ফেইজি কনফুসিয়ানিজমকে “অতীতমুখী” এবং “অবাস্তব” বলে সমালোচনা করেন, কারণ অতীতের সেজ-কিংদের আদর্শ বর্তমানে প্রয়োগ করা যায় না। কনফুসিয়ানিজম “soft power” – নৈতিক প্রভাব, শিক্ষা, পারিবারিক মূল্যবোধ (filial piety) এবং সামাজিক সম্প্রীতির উপর জোর দেয়। শাসকের উচিত নিজেকে সংশোধন করে প্রজাকে অনুপ্রাণিত করা।
তাওইজমের শাসন দর্শন
প্রাকৃতিক সামঞ্জস্য এবং অ-কর্মের নীতিতাওইজম (ডাওইজম) প্রাচীন চীনের একটি মূল দার্শনিক এবং ধর্মীয় ধারা, যা কনফুসিয়ানিজমের সাথে চীনের সংস্কৃতি গড়ে তুলেছে। এর প্রতিষ্ঠাতা লাওজি (খ্রিস্টপূর্ব ৬ষ্ঠ শতাব্দী) এবং জুয়াংজি-এর লেখায় (যেমন তাও তে চিং এবং জুয়াংজি) তাওইজমের শাসন দর্শন মূলত ‘তাও’ (ডাও) – অর্থাৎ বিশ্বের প্রাকৃতিক নিয়ম – অনুসরণ করে শাসন করার উপর জোর দেয়। এটি কঠোর নিয়ন্ত্রণ বা নৈতিক হস্তক্ষেপের পরিবর্তে ‘উ-ওয়েই’ (অ-কর্ম বা প্রচেষ্টাহীন কর্ম) এবং ‘জিরান’ (প্রাকৃতিকতা) এর মাধ্যমে রাষ্ট্রকে স্থিতিশীল করার কথা বলে।
তাওইজমের শাসন দর্শন মানুষ এবং রাষ্ট্রকে প্রকৃতির অংশ হিসেবে দেখে। এটি বিশ্বাস করে যে সবকিছু ‘তাও’ – একটি অদৃশ্য, অব্যক্ত নিয়ম – দিয়ে চলে, যা জোর করে নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। শাসনের লক্ষ্য হলো এই প্রাকৃতিক সামঞ্জস্য বজায় রাখা।
১। উ-ওয়েই (Wu-wei): অ-কর্মের নীতি
উ-ওয়েই মানে ‘না করা’ বা প্রচেষ্টাহীন কর্ম। লাওজি বলেন, শাসককে কম হস্তক্ষেপ করতে হবে, যাতে প্রজা নিজেরা প্রাকৃতিকভাবে চলে। উদাহরণস্বরূপ, তাও তে চিং-এ লেখা: “শাসকের কাজ শেষ হলে, প্রজা বলে যে তারা নিজেরা করেছে।” এটি অর্থাৎ শাসক অদৃশ্যভাবে নির্দেশনা দেয়, জোর করে নয়। এই নীতি রাজনৈতিক অস্থিরতা কমায় এবং স্বাভাবিক উন্নয়নকে উত্সাহিত করে। তাওইজমের এই ধারণা হান ফেইজির লেগালিজমে অনুপ্রাণিত, যেখানে শাসক গোপন কৌশল দিয়ে নিয়ন্ত্রণ করে।\
২। জিরান (Ziran): প্রাকৃতিকতা
জিরান মানে স্বাভাবিকতা বা স্বয়ংসিদ্ধতা। তাওইজম বিশ্বাস করে যে সমাজকে জোর করে গড়ে তোলা যায় না; এটি প্রকৃতির মতো স্বাভাবিকভাবে বিকশিত হবে। শাসকের উচিত অতিরিক্ত আইন বা নিয়ম না চাপানো, কারণ এতে অসামঞ্জস্য সৃষ্টি হয়। লাওজি বলেন, “যত বেশি আইন, তত বেশি চোর।” এটি অর্থাৎ অত্যধিক নিয়ন্ত্রণ অপরাধ বাড়ায়। পরিবর্তে, শাসক নিজেকে তাও-এর সাথে সামঞ্জস্য করে, যাতে সমাজ স্বয়ং নিয়ন্ত্রিত হয়।
৩। সমাজ ও শাসকের সম্পর্ক
তাওইজম অধিকারবাদ (authority) এবং জবরদস্তির বিরোধী। এটি অ্যানার্কিজম-সদৃশ মিনিমাল গভর্নমেন্টের পক্ষে, যেখানে শাসক ‘সেজ-কিং’ হয়ে উঠে – যিনি শাসন করেন না, বরং অনুমতি দেন। হুয়াং-লাও তাওইজমে (পরবর্তীকালীন) শাসককে তাও-এর প্রতিফলন হিসেবে দেখা হয়, যিনি অ-কর্ম দিয়ে শাসন করেন। এটি যুদ্ধ, কর এবং অতিরিক্ত নিয়মের বিরোধী, কারণ এগুলো প্রাকৃতিক সামঞ্জস্য ভাঙে।
তাওইজমের এই দর্শন ব্যক্তিগত জীবন থেকে রাষ্ট্রীয় শাসন পর্যন্ত প্রসারিত, যেখানে লক্ষ্য হলো সরলতা, দয়া, সংযম এবং নম্রতা।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে হান ফেইজির লেগালিজম
হান ফেইজির ধারণাগুলোকে বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, এখানে এগুলোর প্রয়োগে কিছু সমাধান প্রস্তাব আসতে পারে, কিন্তু এর সাথে গণতন্ত্রের সংঘর্ষও আছে।
১। দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন (ফা)
বাংলাদেশে দুর্নীতি একটি মহামারী। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনালের রিপোর্ট অনুসারে, আমরা দুর্নীতিতে উচ্চ স্থানে আছি। হান ফেইজির মতো কঠোর আইন এবং পুরস্কার-শাস্তির ব্যবস্থা দুর্নীতিগ্রস্ত কর্মকর্তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, সরকারি কর্মকর্তাদের জন্য অবজেকটিভ পারফরম্যান্স মেট্রিকস চালু করলে, যেমন হান ফেইজির প্রস্তাবিত মেরিটোক্রেসি, দুর্নীতি কমতে পারে। বর্তমানে বাংলাদেশের অ্যান্টি-করাপশন কমিশনকে আরও কঠোর করে তোলা যায়, যাতে আইন সকলের জন্য সমান হয় – রাজনৈতিক নেতা থেকে সাধারণ কর্মচারী। কিন্তু এতে স্বৈরাচারের ঝুঁকি আছে, যেমন অতীতে সামরিক শাসনের সময় দেখা গেছে।
২। রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় কেন্দ্রীয় ক্ষমতা (শি)
বাংলাদেশের রাজনীতিতে দলীয় সংঘর্ষ এবং হরতাল-অবরোধ সাধারণ। হান ফেইজির কেন্দ্রীয় ক্ষমতার ধারণা এখানে প্রাসঙ্গিক, যেখানে প্রধানমন্ত্রী বা রাষ্ট্রপতির ক্ষমতাকে আরও শক্তিশালী করে অস্থিরতা নিয়ন্ত্রণ করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, COVID-19 মহামারীর সময় সরকারের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ সাহায্য করেছে। কিন্তু এটি গণতন্ত্রের সাথে সংঘর্ষ করে, কারণ হান ফেইজির মডেলে প্রজার অধিকার কম। বাংলাদেশে এটি প্রয়োগ করলে, নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে আরও নিরপেক্ষ করতে হবে, কিন্তু স্বৈরতন্ত্রের আশঙ্কা থাকবে।
৩। প্রশাসনিক কার্যকারিতায় কৌশল (শু)
বাংলাদেশের ব্যুরোক্র্যাসিতে পক্ষপাতিত্ব এবং অদক্ষতা আছে। হান ফেইজির কৌশলগত নিয়ন্ত্রণ দিয়ে মন্ত্রী এবং কর্মকর্তাদের যোগ্যতা-ভিত্তিক মূল্যায়ন করা যায়। উদাহরণস্বরূপ, ডিজিটাল বাংলাদেশের উদ্যোগে ই-গভর্নেন্স চালু করে আইন প্রয়োগকে অটোমেটিক করা যায়, যা হান ফেইজির “যন্ত্রের মতো রাষ্ট্র” ধারণার সাথে মিলে যায়। কিন্তু এতে ব্যক্তিগত স্বাধীনতার হানি হতে পারে, যেমন সাইবার সিকিউরিটি আইনের অপব্যবহার দেখা যায়।
সুবিধা: দুর্নীতি কমে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হয়।
অসুবিধা: স্বৈরাচারের ঝুঁকি, যেমন অতীতে সামরিক শাসনে দেখা গেছে; এটি গণতন্ত্রের সাথে সংঘর্ষ করে।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে কনফুসিয়ানিজম
বাংলাদেশের সংস্কৃতিতে পরিবারবাদ, সম্মান এবং নেতাদের “ভালো উদাহরণ” হওয়ার প্রত্যাশা কনফুসিয়ান মতো। রাজনৈতিক নেতারা প্রায়ই “দেশের জন্য ত্যাগ” বলেন। এটি শিক্ষা ব্যবস্থায় নৈতিকতা শিক্ষা দিয়ে দুর্নীতি কমাতে সাহায্য করতে পারে।
সুবিধা: সামাজিক সম্প্রীতি বাড়ে, যা রাজনৈতিক সংঘর্ষ কমাতে পারে।
অসুবিধা: অত্যধিক আদর্শবাদী; বাস্তবে দুর্নীতি এবং পক্ষপাতিত্ব এটিকে দুর্বল করে, যেমন নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় দেখা যায়।
বাংলাদেশের প্রেক্ষিতে তাওইজম
বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা, দুর্নীতি এবং অতিরিক্ত সরকারি হস্তক্ষেপ একটি চ্যালেঞ্জ। তাওইজমের উ-ওয়েই এখানে অনুপ্রেরণা দিতে পারে, সরকার কম নিয়ম চাপিয়ে স্থানীয় উদ্যোগকে উত্সাহিত করলে, যেমন গ্রামীণ অর্থনীতিতে স্বাভাবিক বিকাশ নিশ্চিত করতে পারে। উদাহরণস্বরূপ, COVID-19-এর সময় কিছু সেক্টরে মিনিমাল ইন্টারভেনশন সাহায্য করেছে। কিন্তু বাংলাদেশের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় তাওইজমের মিনিমালিজম প্রয়োগ করলে দুর্নীতি কমতে পারে, যেমন অতিরিক্ত আইনের পরিবর্তে স্বচ্ছতা-ভিত্তিক গভর্নেন্স। তবে এটি লেগালিজমের কঠোরতার সাথে মিলিয়ে নিতে হবে, না হলে অরাজকতা হতে পারে।
সুবিধা: দুর্নীতি কমে স্বচ্ছতা বাড়ে।
অসুবিধা: অরাজকতার ঝুঁকি; গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় কঠোর আইন ছাড়া এটি অকার্যকর হতে পারে।
তিন দর্শনের তুলনামূলক বিশ্লেষণ
| বিষয় | লেগালিজম (হান ফেইজি) | কনফুসিয়ানিজম | তাওইজম |
| মানুষের স্বভাব | স্বার্থপর, দুষ্ট; আইন দিয়ে নিয়ন্ত্রণ। | স্বাভাবিকভাবে ভালো; শিক্ষা দিয়ে উন্নত। | প্রকৃতির অংশ; স্বাভাবিকভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ। |
| শাসনের ভিত্তি | ফা (আইন), শু (কৌশল), শি (ক্ষমতা)। | রেন (দয়া), লি (আচার), উদাহরণ। | উ-ওয়েই (অ-কর্ম), জিরান (প্রাকৃতিকতা)। |
| শাসকের ভূমিকা | অটুট ক্ষমতা; শাস্তি-পুরস্কার। | নৈতিক আদর্শ; প্রজাকে অনুপ্রাণিত। | অদৃশ্য নির্দেশনা; কম হস্তক্ষেপ। |
| আইনের ভূমিকা | প্রধান; সমান প্রয়োগ। | গৌণ; নৈতিকতা প্রধান। | মিনিমাল; অতিরিক্ত আইন অসামঞ্জস্য সৃষ্টি করে। |
| লক্ষ্য | রাষ্ট্রের শক্তি এবং স্থিতিশীলতা। | সামাজিক সম্প্রীতি, নৈতিক উন্নয়ন। | প্রাকৃতিক সামঞ্জস্য, সরলতা। |
লেগালিজম কনফুসিয়ানিজমকে “অবাস্তব” এবং তাওইজমের উ-ওয়েইকে গ্রহণ করে কিন্তু কঠোর করে। কনফুসিয়ানিজম লেগালিজমকে “নির্মম” এবং তাওইজমকে “নিষ্ক্রিয়” বলে মনে করে। তাওইজম উভয়ের সক্রিয়তাকে প্রত্যাখ্যান করে প্রাকৃতিকতা চায়।
বাংলাদেশে লেগালিজম দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণে কাজ করতে পারে, কনফুসিয়ানিজম সামাজিক সম্প্রীতিতে এবং তাওইজম মিনিমাল হস্তক্ষেপে। উদাহরণস্বরূপ, সাইবার সিকিউরিটি আইন লেগালিজম-সদৃশ কঠোরতা দেখায়, কিন্তু অপব্যবহার হলে স্বাধীনতা হানি হয়। আদর্শ হলো সংশ্লেষণ – লেগালিজমের আইন + কনফুসিয়ান নৈতিকতা + তাওইজমের প্রাকৃতিকতা। এটি গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে পারে, কিন্তু স্বৈরতন্ত্র এড়াতে হবে।
প্রাচীন চীনা দর্শনগুলো বাংলাদেশের রাজনৈতিক সমীকরণে জন্য একটি আয়না। লেগালিজম দুর্নীতি কমাতে, কনফুসিয়ানিজম নৈতিকতা গড়তে এবং তাওইজম স্বচ্ছতা বাড়াতে সাহায্য করতে পারে। কিন্তু এগুলোকে গণতন্ত্রের সাথে মিলিয়ে নিতে হবে, না হলে স্বাধীনতার হানি হবে। বাংলাদেশের নেতাদের জন্য এটি একটি সতর্কতা – শাসন কি কঠোরতা দিয়ে, নৈতিকতা দিয়ে, নাকি প্রাকৃতিক সামঞ্জস্য দিয়ে? চীনের মতো সংশ্লেষণ করে আমরা একটি শক্তিশালী রাষ্ট্র গড়তে পারি।


Discussion
No comments yet.