you're reading...
Random Thoughts

Hero থেকে Human: কেন আমরা আর নিখুঁত আইডল চাই না

মানুষের ইতিহাস মূলত নায়ক নির্মাণের ইতিহাস। সভ্যতার শুরু থেকে মানুষ নিজেদের সীমাবদ্ধতা অতিক্রম করতে চেয়েছে এবং সেই আকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন ঘটেছে বীর, দেবতা, বিপ্লবী, নেতা কিংবা তারকারূপী আদর্শের নির্মাণে। একসময় সমাজ তার নায়কদের এমনভাবে নির্মাণ করত যেন তারা ভুল-ত্রুটির ঊর্ধ্বে, মানসিক দুর্বলতার বাইরে এবং নৈতিক বিচ্যুতি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত। কিন্তু আধুনিক বিশ্বে এসে এই প্রবণতায় একটি মৌলিক পরিবর্তন ঘটেছে। এখন, নিখুঁততার প্রতি আমাদের আকর্ষণ কমে গেছে। আমরা এখন আর নিখুঁত আইডল চাই না; বরং আমরা মানবিক, অসম্পূর্ণ, সংগ্রামী এবং সম্পর্কযোগ্য মানুষকে অনুসরণ করতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি।

নিখুঁত আইডলের অতীত ধারণা অস্বাস্থ্যকর বলে প্রমাণিত হয়েছে। আগে, মিডিয়াগুলো সেলিব্রিটিদের একটি আদর্শিক ছবি তৈরি করত – যেখানে তারা ছিলেন নির্ভুল, ধনী এবং সফল। কিন্তু এই ছবি মানুষের মনে অসম্ভব প্রত্যাশা তৈরি করে, যা তার মানসিক স্বাস্থ্যের উপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ, যখন আমরা কোনো সেলিব্রিটিকে নিখুঁত মনে করি, তখন তাদের অসম্পূর্ণতা দেখলে আমরা হতাশ হই বা নিজেদের অপর্যাপ্ত মনে করি। লস অ্যাঞ্জেলস টাইমসের একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে যে, সেলিব্রিটি কালচার এখন “অপ্রচলিত আর্কিটাইপ” হয়ে গেছে, কারণ মানুষ এখন “বনেট টিকটক” (অনলাইন ভিডিও যেখানে সাধারণ মানুষ তাদের দৈনন্দিন জীবন শেয়ার করে) এর মতো সত্যিকারের সামগ্রী পছন্দ করে, যা নিখুঁততার পরিবর্তে মানবিকতা দেখায়।

এই পরিবর্তনের পেছনে প্রথম যে কারণটি কাজ করছে তা হলো তথ্যপ্রযুক্তির যুগে স্বচ্ছতার বিস্তার। অতীতে কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন, ব্যর্থতা কিংবা দুর্বলতা জনসমক্ষে খুব সহজে প্রকাশ পেত না। ফলে সমাজ তাকে প্রায় পৌরাণিক উচ্চতায় বসাতে পারত। কিন্তু আজকের ডিজিটাল বাস্তবতায় প্রতিটি মানুষের সাফল্যের পাশাপাশি ব্যর্থতাও দৃশ্যমান। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম, লাইভ সাক্ষাৎকার, আত্মজীবনী এবং অনুসন্ধানী সাংবাদিকতা – সব মিলিয়ে একজন ব্যক্তিকে সম্পূর্ণ মানুষ হিসেবে দেখতে শেখাচ্ছে। এই শিফটের ফলে, আমরা আইডলাইজেশনকে “মানুষকে অমানবিক করা” হিসেবে দেখি, যা তাদেরকে একটি পণ্যে পরিণত করে।

যখন আমরা দেখি কোনো সফল উদ্যোক্তা একাধিকবার ব্যর্থ হয়েছেন, কোনো বিশ্বমানের খেলোয়াড় মানসিক চাপে ভেঙে পড়েছেন, কিংবা কোনো নেতা নিজের সিদ্ধান্তের ভুল স্বীকার করেছেন – তখন আমরা অনুভব করি, নিখুঁততার ধারণাটি আসলে নির্মিত, প্রাকৃতিক নয়। জিকিউ ম্যাগাজিনের একটি নিবন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে যে, আধুনিক সেলিব্রিটিরা “জাস্ট লাইক আস” (আমাদের মতো) দেখাতে চান, যেমন টেলর সুইফট তার কনসার্টে নিজেকে “একাকী মিলেনিয়াল নারী” হিসেবে বর্ণনা করেন, যাতে ভক্তরা নিজেদের তার সাথে আরো বেশী সম্পর্কিত বোধ করেন।

কিন্তু এই রিলেটেবিলিটি যদি সত্যিকার না হয়, তাহলে তা ব্যাকফায়ার করে। উদাহরণস্বরূপ, চার্লি এক্সসিএক্স বা চ্যাপেল রোনের মতো শিল্পীরা সফল কারণ তারা সত্যিকারের নিজস্বতা দেখান। এই পরিবর্তন বিশ্বব্যাপী, বিশেষ করে জেনারেশন জি-এর মধ্যে, যারা “ব্লক সেলিব্রিটিজ” মুভমেন্টের মাধ্যমে ট্র্যাডিশনাল আইডলাইজেশন প্রত্যাখ্যান করছে।

এছাড়া অর্থনৈতিক এবং সামাজিক অসমতুল্যতা নিখুঁত আইডলের প্রতি অসন্তোষ বাড়িয়েছে। ২০২০-এর দশকে, কোভিড মহামারী, অর্থনৈতিক মন্দা এবং যুদ্ধের মতো ঘটনা মানুষকে বাস্তবতার মুখোমুখি করেছে। সেলিব্রিটিরা যখন তাদের বিলাসবহুল জীবন দেখান, তখন তা অসমতুল্যতার প্রতীক হয়ে ওঠে। মীর ডট কমের একটি নিবন্ধে বলা হয়েছে যে, সেলিব্রিটি কালচারের প্রতি অসন্তোষ বেড়েছে কারণ তাদেরকে “মিট শিল্ডস ফর দ্য রিচ” (ধনীদের রক্ষাকবচ) হিসেবে দেখা হয়। বিশেষ করে ব্ল্যাক লাইভস ম্যাটার বা ইজরায়েল-গাজা যুদ্ধের মতো ইস্যুতে তাদের অপোরচুনিস্টিক অ্যাকটিভিজম এটিকে আরো উসকে দিয়েছে।

উদাহরণস্বরূপ, ২০২৪ মার্কিন প্রেসিডেন্টশিয়াল ইলেকশনে কামালা হ্যারিসের ক্যাম্পেইন সেলিব্রিটিদের (বিয়ন্সে, টেলর সুইফট, কার্ডি বি) উপর নির্ভর করেছিল, কিন্তু এটি ব্যর্থ হয়েছে কারণ সাধারণ মানুষ (যেমন টিকটক ইউজাররা) এই গ্ল্যামারকে “ডিসফাংশনাল” মনে করেছে। এই ঘটনা বিশ্বব্যাপী প্রতিফলিত হয়েছে, যেমন কেপপ ইন্ডাস্ট্রিতে (রেডিট আলোচনায়) যেখানে ফ্যানরা আইডলদের “পণ্য” হিসেবে দেখে অস্বস্তি প্রকাশ করে।

এর বিপরীতে একটি কার্যকরী উদাহরণ হতে পারেন আমেরিকান গায়িকা বিলি আইলিশ। তিনি তার মেন্টাল হেলথ স্ট্রাগল, বডি ইমেজ ইস্যু এবং অসম্পূর্ণতা খোলাখুলি শেয়ার করেন, যা তাকে নিখুঁত আইডল নয় বরং রিলেটেবল করে তুলেছে। তরুণরা তার প্রশংসা করে, কারণ তিনি “পারফেকশন” চাপিয়ে দেন না। আরেকটি উদাহরণ হতে পারে অলিম্পিক জিমন্যাস্ট সিমোন বাইলস, যিনি ২০২০ টোকিও অলিম্পিকে মেন্টাল হেলথের জন্য প্রতিযোগিতা থেকে সরে দাঁড়ান। এটি বিশ্বব্যাপী মেন্টাল হেলথ আলোচনা শুরু করে, দেখিয়ে যে নিখুঁততা অসম্ভব এবং অস্বাস্থ্যকর। ইউরোপে, সুইডিশ অ্যাকটিভিস্ট গ্রেটা থুনবার্গ তার অটিজমকে লুকান না, যা তাকে একটি সত্যিকারের রোল মডেল করে তুলেছে – তিনি নিখুঁত নন, কিন্তু প্রভাবশালী।

বিশ্বব্যাপী রেফারেন্স হিসেবে, ২০২০-এর দশকে এই শিফট আরো স্পষ্ট হয়ে উঠেছে। আমেরিকায় হলিউডের সেলিব্রিটি কালচারের পতন দেখা যাচ্ছে, যেখানে মানুষ “এভরিডে সেলিব্রিটিজ” (মাইক্রো-ইনফ্লুয়েন্সার) পছন্দ করে।

এশিয়ায়, কেপপ ফ্যানরা আইডলদের অমানবিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। ইউরোপ এবং মধ্যপ্রাচ্যে, যুদ্ধ এবং অর্থনৈতিক সংকট সেলিব্রিটি অ্যাকটিভিজমকে “পারফর্মেটিভ” হিসেবে চিহ্নিত করে। একটি ২০২৫-এর অ্যানালিসিসে বলা হয়েছে যে, আইডলাইজেশন “অপ্রচলিত” হয়ে গেছে কারণ মানুষ নিজেদের সম্প্রদায় থেকে অনুপ্রেরণা খোঁজে।

মনোবিজ্ঞানের গবেষণাও এই পরিবর্তনকে সমর্থন করে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোবিজ্ঞানী ক্যারল ডুয়েকের “Growth Mindset” তত্ত্ব বলছে, যারা নিজেদের উন্নয়নশীল ও শেখার যোগ্য সত্তা হিসেবে দেখে, তারা দীর্ঘমেয়াদে বেশি সফল ও মানসিকভাবে স্থিতিশীল হয়। নিখুঁত আইডল সংস্কৃতি মানুষকে স্থির মানসিকতায় আবদ্ধ করে, যেখানে ভুল করা মানেই ব্যর্থতা। অন্যদিকে মানবিক আইডল আমাদের শেখায় যে ভুল প্রক্রিয়ার অংশ, এবং উন্নতি একটি চলমান যাত্রা। ফলে আমরা এমন আদর্শের প্রতি আকৃষ্ট হই, যারা নিজেদের অসম্পূর্ণতাকে স্বীকার করে এবং সেই সীমাবদ্ধতার মধ্য দিয়েই এগিয়ে যায়।

বিশ্বপরিসরে এই পরিবর্তনের বাস্তব উদাহরণও স্পষ্ট। স্টিভ জবসকে একসময় প্রযুক্তি-দেবতা হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও তাঁর জীবনীতে দেখা যায়, তিনি অ্যাপল থেকে বহিষ্কৃত হয়েছিলেন। তার একাধিক সিদ্ধান্ত ব্যর্থ হয়েছিলো এবং ব্যক্তিগত জীবনেও নানা দ্বন্দ্বের মধ্যে দিয়ে গেছেন তিনি। কিন্তু তাঁর পুনরাগমন এবং শেখার ক্ষমতাই তাঁকে অনুপ্রেরণার প্রতীক করে তুলেছে। এখানে নিখুঁততা নয়, বরং পুনর্গঠনের ক্ষমতাই মুখ্য হয়ে উঠেছে।

খেলাধুলার জগতেও একই চিত্র দেখা যায়। লিওনেল মেসি বা ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদো – তাঁদের সাফল্য কিংবদন্তিতুল্য হলেও, তাঁরা বহুবার সমালোচিত হয়েছেন, গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচে ব্যর্থ হয়েছেন, এমনকি মানসিক চাপে ভেঙেও পড়েছেন। তবুও তাঁরা ফিরে এসেছেন, নিজেদের পুনর্গঠন করেছেন। এই মানবিক দিকই তাঁদেরকে আরও গ্রহণযোগ্য করে তুলেছে। মানুষ তাঁদের মধ্যে দেবত্ব নয়, অধ্যবসায়ের মানবিক শক্তি দেখে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো মানসিক স্বাস্থ্যের প্রশ্ন। নিখুঁততার সংস্কৃতি সামাজিকভাবে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষণায় দেখা গেছে, অতিরিক্ত পারফরম্যান্স-চাপ ও নিখুঁততার প্রত্যাশা তরুণদের মধ্যে উদ্বেগ ও বিষণ্নতার হার বাড়িয়ে দেয়। যখন সমাজ একজন ব্যক্তিকে ভুলের ঊর্ধ্বে স্থাপন করে, তখন সেই ব্যক্তি নিজেও মানবিক দুর্বলতা প্রকাশ করতে সংকোচ বোধ করেন। এর বিপরীতে, যখন জনসম্মুখের ব্যক্তিরা নিজেদের সংগ্রাম নিয়ে খোলামেলা কথা বলেন, তখন তা সামাজিক স্বস্তি তৈরি করে। উদাহরণস্বরূপ, টেনিস খেলোয়াড় নাওমি ওসাকা বা সাঁতারু মাইকেল ফেলপস মানসিক স্বাস্থ্যের বিষয়টি প্রকাশ্যে তুলে ধরেছেন। তাঁদের এই মানবিক স্বীকারোক্তি নিখুঁততার মিথ ভেঙে দিয়েছে এবং বহু মানুষকে সাহস জুগিয়েছে।

সমসাময়িক সামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবর্তনও এখানে প্রভাব ফেলেছে। উত্তর-আধুনিক সমাজ ব্যক্তি-অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেয়। এখন মানুষ নায়কের সঙ্গে দূরত্ব নয়, সংযোগ চায়। আগে নায়ক ছিলেন উচ্চাসনে বসানো এক দূরবর্তী প্রতীক; এখন তিনি সামাজিক মাধ্যমে প্রতিক্রিয়া জানান, নিজের ব্যর্থতা শেয়ার করেন, সাধারণ জীবনের মুহূর্ত প্রকাশ করেন। এই ঘনিষ্ঠতা মানুষের মধ্যে অনুভুতির জন্ম দেয় যে, – “সে আমার মতোই।” ফলে আইডল নয়, সম্পর্কযোগ্য মানুষই বেশি গ্রহণযোগ্য হয়ে ওঠে।

বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও একই প্রবণতা লক্ষ্য করা যায়। তরুণ প্রজন্ম এখন এমন ব্যক্তিত্বকে অনুসরণ করতে আগ্রহী, যিনি শুধু সাফল্যের গল্প শোনান না, বরং ব্যর্থতার অভিজ্ঞতাও খোলাখুলি তুলে ধরেন। উদ্যোক্তাদের মধ্যে যারা ব্যবসায়িক ঝুঁকি, আর্থিক ক্ষতি কিংবা ব্যর্থ উদ্যোগের কথা বলেন, তারা তরুণদের কাছে বেশি বাস্তব মনে হয়। এই বাস্তবতা অনুপ্রেরণাকে আরও বিশ্বাসযোগ্য করে তোলে।

সবশেষে বলা যায়, আমরা নিখুঁত আইডল চাই না কারণ আমরা নিজেরাও নিখুঁত নই। নিখুঁততার দাবি মানুষকে বিচ্ছিন্ন করে, কিন্তু মানবিকতা মানুষকে যুক্ত করে। আমরা এমন কাউকে অনুসরণ করতে চাই, যিনি আমাদের মতো ভুল করেন, দ্বিধায় পড়ে ভোগেন, কিন্তু থেমে না গিয়ে এগিয়ে যান। আধুনিক সমাজে অনুপ্রেরণার শক্তি আসে দেবত্ব থেকে নয়, বরং মানবিক সাহস থেকে।

নিখুঁত আইডল আমাদেরকে অসম্ভব মানদণ্ডে বাঁধে এবং সত্যিকারের মানবিক সংযোগ থেকে দূরে সরিয়ে দেয়। এর পরিবর্তে, “Hero থেকে Human” এই রূপান্তর আসলে সমাজের পরিণত বোধের প্রতিফলন। এতে, সমাজ আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বাস্তবসম্মত হয়ে উঠবে, যা শেষমেশ আমাদের সকলের জন্য উপকারী। আমরা এখন আর কাউকে নিয়ে নিখুঁত কোন চিত্র আঁকি না; আমরা মানুষের ভেতরের শক্তিকে স্বীকার করি। কারণ শেষ পর্যন্ত মানুষকে অনুপ্রাণিত করে কোনো নিখুঁত ভাবমূর্তি নয়, বরং এমন একজন মানুষ – যিনি অসম্পূর্ণ হয়েও এগিয়ে যাওয়ার সাহস রাখেন।

Unknown's avatar

About Md. Moulude Hossain

FinTech | Digital Payment | Product Strategy | Product Management | EMV | Business Development

Discussion

No comments yet.

Leave a comment

upay-GP Offers

Blog Stats

  • 120,230 hits

Archives

upay bonus

Recent Post