
জিম কলিন্সের গবেষণাধর্মী বই Good to Great-এর “Good is the Enemy of Great” উক্তিটি শুধু একটি নয়, বরং এটি পুরপুরি একটি দর্শন। জীবনে ব্যর্থতা এবং সাফল্যের দেয়ালের বাইরের ধারণা এই উক্তিতে উঠে এসেছে মনস্তাত্ত্বিক ও প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতার রুপে। ব্যর্থতা সবসময় উন্নতির প্রধান বাধা নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রে “যথেষ্ট ভালো”-এর আত্মতুষ্টি প্রকৃত উন্নতির সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা। মানুষের অগ্রযাত্রার ইতিহাস বিশ্লেষণ করলে একটি সূক্ষ্ম কিন্তু গভীর সত্য স্পষ্ট হয়ে ওঠে। আর “Good is the Enemy of Great” এই উক্তিটি মূলত সেই ইঙ্গিতই দেয়। অনেক ক্ষেত্রেই সন্তুষ্টি ও স্থিতাবস্থা উৎকর্ষতার সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে ফেলে। অধিকাংশ সময় সাফল্য এবং কার্যকর অবস্থানের আত্মতুষ্টি মৌলিক রূপান্তরের প্রয়োজনীয় চাপ বা প্রেরণা তৈরির অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।
অধিকাংশ সময় মনস্তাত্ত্বিকভাবে যখন আমরা কোনোকিছুতে ভালো অবস্থানে পৌঁছে যাই, তখন সেই সন্তুষ্টি আমাদের মহানত্ব অর্জনের পথে বাধা সৃষ্টি করে। ভালোতে আটকে গেলে আমরা আরও উন্নতি করার প্রেরণা হারিয়ে ফেলি, যা মহান হওয়ার স্বপ্নকে ছিন্নভিন্ন করে দেয়। এটি শুধু ব্যবসায়িক সাফল্যের কথা নয়, বরং জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রযোজ্য – ব্যক্তিগত উন্নয়ন, সম্পর্ক, শিল্পকলা বা সমাজসেবা।
এই ধারণাটি বোঝার জন্য প্রথমে “ভালো” এবং “মহান” – এই দুই অবস্থার প্রকৃতি বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। “ভালো” বলতে সাধারণত এমন একটি মানকে বোঝায় যা গ্রহণযোগ্য, কার্যকর এবং প্রশংসনীয়। এটি ব্যর্থতা নয়; বরং এটি এমন একটি অবস্থান, যেখানে মৌলিক ত্রুটি নেই এবং কার্যকারিতা নিশ্চিত। অন্যদিকে “মহান” বলতে বোঝায় এমন একটি মান, যা প্রচলিত মানদণ্ডকে অতিক্রম করে নতুন মানদণ্ড স্থাপন করে। মহানতা কেবল সফলতার সমার্থক নয়; এটি প্রভাব, স্থায়িত্ব, মৌলিকতা এবং রূপান্তরের সঙ্গে যুক্ত।
মানুষ যখন নিজেকে “ভালো” বলে সংজ্ঞায়িত করতে শুরু করে, তখন সেই পরিচয়ই একধরনের মানসিক সীমারেখা তৈরি করে। ব্যক্তি তখন নিজের বর্তমান অবস্থাকে রক্ষা করাকেই প্রধান লক্ষ্য মনে করে, উন্নত করার চেষ্টা নয়। ফলে “ভালো” আর একটি অর্জন থাকে না; এটি হয়ে ওঠে পরিচয়ের নিরাপদ আশ্রয়। মহানতার পথে অগ্রসর হতে হলে মানুষকে বারবার নিজের পরিচয় পুনর্গঠন করতে হয় – নিজেকে নতুন করে শেখার অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে হয়।
প্রথমে বিবেচনা করা যাক ব্যবসা প্রতিষ্ঠান সংক্রান্ত একটি সাধারণ উদাহরণ। ধরুন, একটি কোম্পানি তার পণ্যগুলোকে ভালো মানের করে বাজারে নিয়ে এসেছে। পণ্য বিক্রি হচ্ছে, লাভ হচ্ছে, ক্রেতারা সন্তুষ্ট কর্মীরা সন্তুষ্ট। কিন্তু এই ‘ভালো’ অবস্থায় থেকে তারা আরও উন্নতি করার চেষ্টা করে না। ফলস্বরূপ, প্রতিযোগীরা এগিয়ে যায় এবং সেই কোম্পানি ধীরে ধীরে পিছিয়ে পড়ে। এখানে ভালোর আত্মতুষ্টি মহানের শত্রু হয়ে দাঁড়ায়। জিম কলিন্সের গবেষণায় দেখা যায়, যেসব কোম্পানি ‘ভালো’তে সন্তুষ্ট হয়নি, তারাই ‘মহান’ স্তরে পৌঁছেছে। উদাহরণস্বরূপ, ওয়ালগ্রিনস কোম্পানি। তারা শুধু ভালো ফার্মেসি চেইন হয়ে থাকেনি; তারা নিরলসভাবে উন্নয়ন করে বিশ্বের অন্যতম শীর্ষস্থানীয় খুচরা চেইন হয়েছে। কলিন্স বলেন, “We don’t have great schools, principally because we have good schools. We don’t have great government, principally because we have good government.” এই উক্তিটি দেখায় কীভাবে ভালোর সন্তুষ্টি আমাদের সমাজের মহানত্বকে বাধা দেয়।
এখানে নোকিয়ার উদাহরণও অনেকা বেশী প্রাসঙ্গিক। মোবাইল ফোন বাজারে তারা একসময় প্রভাবশালী অবস্থানে ছিল। তাদের পণ্য নির্ভরযোগ্য, জনপ্রিয় এবং বাণিজ্যিকভাবে সফল ছিল। কিন্তু তারা যখন স্মার্টফোন বিপ্লবের গভীর তাৎপর্য অনুধাবন করতে ব্যর্থ হলো, তখন তাদের পূর্ববর্তী সাফল্যই তাদের আত্মতুষ্টির কারণ হয়ে দাঁড়াল। এনড্রয়েডকে প্রত্যাখ্যানের পিছনে নকিয়ার সেই আত্মতুষ্টিই ছিলো সবচেয়ে বড় মোহ। এর বিপরীতে, এনড্রয়েডকে পুঁজি করে স্যামসাং-এর মত কোম্পানি মোবাইলের বাজার দখলে নেয়। এছাড়া অ্যাপল প্রচলিত “ভালো ফোন” ধারণাকে অতিক্রম করে ফোনকে একটি বহুমাত্রিক ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মে রূপান্তর করল। এখানে পার্থক্যটি কেবল প্রযুক্তিগত নয়; এটি মানসিকতার পার্থক্য নিজেদের অবস্থান নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা বনাম মানদণ্ড পুনর্নির্ধারণ করা।
সমসাময়িক বিশ্বে প্রযুক্তি ও জ্ঞানের গতি এত দ্রুত যে আজকের দক্ষতা আগামীকালের ন্যূনতম মানে পরিণত হয়। ফলে “ভালো” একটি সাময়িক অবস্থা, স্থায়ী অবস্থান নয়। যে ব্যক্তি বা প্রতিষ্ঠান নিজেদের বর্তমান দক্ষতার ওপর স্থির থাকে, তারা সময়ের সাথে সাথে পিছিয়ে পড়ে; কারণ বিশ্ব থেমে থাকে না।
এই মনস্তাত্ত্বিক বাস্তবতা ব্যক্তিগত জীবনেও সমানভাবে প্রযোজ্য। একজন ছাত্র যদি কেবল পরীক্ষায় ভালো নম্বর পাওয়াকেই লক্ষ্য মনে করে, তবে সে একটি নির্দিষ্ট মান অর্জন করতে পারে। কিন্তু জ্ঞানের গভীরতা, বিশ্লেষণক্ষমতা এবং সৃজনশীল চিন্তার বিকাশ তখনই সম্ভব, যখন সে নম্বরের সীমা অতিক্রম করে শেখার আনন্দ ও অনুসন্ধিৎসাকে অগ্রাধিকার দেয়। আরিস্টটলের একটি উক্তি এখানে নিয়ে আসার লোভ সামলাতে পারছি না – “Excellence is not an act, but a habit.” উৎকর্ষতা কোনো বিচ্ছিন্ন অর্জন নয়; এটি ধারাবাহিক অনুশীলন, আত্মসমালোচনা এবং উন্নতির অভ্যাসের ফল।
ভালো থাকা মানুষকে একধরনের নৈতিক নিশ্চিন্ততা দেয়, সে মনে করে সে নিজের দায়িত্ব ঠিকভাবে পালন করছে। কিন্তু মহানতা দায়িত্ব পালনের চেয়েও বড় কিছু দাবি করে; এটি দায়িত্বের পরিধি বাড়াতে বাধ্য করে। একজন পেশাজীবী নিয়ম মেনে কাজ করলে তিনি ভালো, কিন্তু যিনি নিজের ক্ষেত্রকে উন্নত করার জন্য নতুন চিন্তা যোগ করেন, তিনি মহানতার পথে হাঁটেন।
আত্মতুষ্টি কেন এত শক্তিশালী অন্তরায় – এর জবাবটা লুকিয়ে আছেন মানুষের মনস্তত্ত্বে। মানুষ স্বভাবতই নিরাপত্তা ও স্বস্তি কামনা করে। যখন কোনো লক্ষ্য অর্জিত হয় এবং সামাজিক স্বীকৃতি পাওয়া যায়, তখন মস্তিষ্ক সেটিকে স্থিতাবস্থার জন্য যথেষ্ট মনে করে। এই পর্যায়ে নতুন ঝুঁকি গ্রহণ, নতুন বিনিয়োগ বা মৌলিক পরিবর্তনের প্রয়োজনীয়তা কম অনুভূত হয়। কিন্তু ভালোকে পিছনে ফেলে মহত্ত্ব অর্জনের জন্য প্রায়শই এই নিরাপত্তাবোধকে অতিক্রম করতে হয়। এ প্রসঙ্গে স্টিভ জবসের একটি উক্তি উল্লেখ করার দাবি রাখে। তিনি বলেছিলেন, “Be a yardstick of quality” – এই উক্তির অন্তর্নিহিত তাৎপর্য হলো, নিজের মানদণ্ড এমনভাবে নির্ধারণ করা, যাতে তা প্রচলিত মানকে ছাড়িয়ে যায়।
আমরা সাধারণত ব্যর্থতাকে ভয় পাই। কিন্তু প্রকৃত ভয় হওয়া উচিত স্থিতাবস্থাকে। ব্যর্থতা মানুষকে প্রশ্ন করতে শেখায়, নতুন পথ খুঁজতে বাধ্য করে। কিন্তু “ভালো” অবস্থায় মানুষ প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়। সেখানে চ্যালেঞ্জ কম, আত্মসমালোচনা কম, এবং উন্নতির প্রয়োজনীয়তা অনুভূত হয় না। ফলে ব্যর্থতা উন্নতির সূচনা হতে পারে, কিন্তু স্থির ভালো অবস্থাই উন্নতির সমাপ্তি ডেকে আনে।
সমাজসেবার ক্ষেত্রেও এই সত্য প্রযোজ্য। ধরুন, একটি এনজিও গ্রামীণ এলাকায় ভালো মানের শিক্ষা প্রদান করছে। তারা সন্তুষ্ট হয়ে থাকলে, তারা কখনো সেই শিক্ষাকে মহান স্তরে নিয়ে যেতে পারবে না, যেমন প্রযুক্তি-ভিত্তিক শিক্ষা বা জাতীয় স্তরের প্রভাব। পৃথিবীতে অনেক রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব আছেন যারা নিজেদের ভালো থাকা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকলে, ইতিহাসের পাতায় তাদের অস্তিত্বই থাকতো না। “ভালো আছি” নয়, বরং তাদের উৎকর্ষতার পিছনে ছিলো মানুষের জন্য ভালোবাসা। নিজেদের অবস্থান আর জীবন নিয়ে সন্তুষ্টির চেয়ে তাদের কাছে মূখ্য ছিলো আরো বড় কিছুর। ভালো থাকার এই সন্তুষ্টিকে জয় করতে পেরেছেন বলেই ইতিহাসে তারা মহত্ত্বের উদাহরণ।
তবে এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠে আসে: “ভালো” কি তবে অপ্রয়োজনীয় বা অগ্রহণযোগ্য? নিশ্চয়ই নয়। “ভালো” হলো একটি ভিত্তি, কিন্তু সেটি যদি চূড়ান্ত লক্ষ্য হয়ে যায়, তবে সেটিই সমস্যা। ভালো অবস্থা থেকে মহান অবস্থায় উত্তরণের জন্য প্রয়োজন সমালোচনামূলক আত্মমূল্যায়ন, দীর্ঘমেয়াদি দৃষ্টিভঙ্গি এবং পরিবর্তনকে স্বাগত জানানোর মানসিকতা। জিম কলিন্স তাঁর গবেষণায় দেখিয়েছেন যে মহান প্রতিষ্ঠানগুলো “brutal facts” স্বীকার করতে দ্বিধা করে না; তারা নিজেদের সীমাবদ্ধতাকে অস্বীকার না করে, বরং তা বিশ্লেষণ করে রূপান্তরের পথে এগোয়।
যেমন একজন শিক্ষকের কথা বিবেচনা করুন। তিনি নিয়ম মেনে পাঠদান করেন, সিলেবাস সম্পূর্ণ করেন এবং পরীক্ষার ফল নিশ্চিত করেন – তিনি নিঃসন্দেহে ভালো শিক্ষক। কিন্তু যিনি শিক্ষার্থীদের চিন্তা করতে শেখান, প্রশ্ন করতে উৎসাহিত করেন এবং আত্মবিশ্বাস গড়ে তোলেন, তিনি কেবল পাঠদান করেন না; তিনি প্রভাব সৃষ্টি করেন। মহানতার সঙ্গে এই প্রভাব ও দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন অঙ্গাঙ্গিভাবে জড়িত।
মূলত “Good is the Enemy of Great” একটি সতর্কবার্তা। এটি ভালো অবস্থাকে প্রত্যাখ্যান করার আহ্বান নয়, বরং সেখানে থেমে না থাকার নির্দেশনা। যে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা জাতি নিজেকে প্রশ্ন করার সাহস রাখে, নিজের সীমা স্বীকার করতে প্রস্তুত এবং ক্রমাগত উন্নতির জন্য প্রস্তুত – তাদের জন্য মহানতার পথ উন্মুক্ত থাকে। আর যারা “যথেষ্ট ভালো” অবস্থাকে চূড়ান্ত মনে করে, তাদের অগ্রযাত্রা সেখানেই থেমে যায়।
মহান হওয়ার আকাঙ্ক্ষা সবসময় স্বস্তির বিরুদ্ধে এক অন্তর্দ্বন্দ্ব তৈরি করে। একদিকে থাকে নিরাপত্তা ও সামাজিক স্বীকৃতি, অন্যদিকে অনিশ্চয়তা ও পুনরারম্ভের সম্ভাবনা। যারা মহানতার পথে হাঁটে তারা এই দ্বন্দ্ব এড়িয়ে যায় না; বরং গ্রহণ করে। তারা জানে উৎকর্ষতা কোনো চূড়ান্ত গন্তব্য নয়, এটি একটি চলমান যাত্রা – যেখানে প্রতিটি সাফল্যের পর নতুন প্রশ্ন জন্ম নেয়।
আসলে, এই ধারণাটি আমাদের জীবনকে পুনর্মূল্যায়ন করতে বাধ্য করে। এটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, সন্তুষ্টি একটি ফাঁদ, যা আমাদের সম্ভাবনাকে সীমাবদ্ধ করে। গল্প, উদাহরণ এবং উক্তিগুলো থেকে আমরা শিখি যে, মহানত্ব অর্জন করতে হলে ভালোকে অতিক্রম করতে হবে। অ্যারিস্টটলের উক্তি দিয়ে শেষ করি: “We are what we repeatedly do. Excellence, then, is not an act, but a habit.” অর্থাৎ, উৎকর্ষতা একটি অভ্যাস, যা ভালোতে থেমে না গিয়ে নিরন্তর চেষ্টার মাধ্যমে অর্জিত হয়। অতএব, প্রকৃত চ্যালেঞ্জ ব্যর্থতা নয়; প্রকৃত চ্যালেঞ্জ হলো আত্মতুষ্টি। মহানতা অর্জনের প্রথম শর্ত হলো – ভালোকে সম্মান করা, কিন্তু তাকে কখনোই চূড়ান্ত গন্তব্য হিসেবে মেনে না নেয়া।


Discussion
No comments yet.