
সময়ের চাকা ঘুরে আজ আরও একটি বছর পূর্ণ হলো। নিশকা, জীবনের চারটি বসন্ত পেরিয়ে তুমি আজ পঞ্চম বছরে পদার্পণ করলে। এখনো মনে হয় এই তো সেদিন প্রথমবার তোমার দাদু তোয়ালে মোড়ানো তোমাকে আমার কোলে দিয়েছিলো। আর আজ সেই ছোট্ট শিশুটি নিজের পছন্দ, নিজস্ব যুক্তি আর এক আকাশ সমান স্বপ্ন নিয়ে আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে। তবে তোমার আগের জন্মদিনগুলো থেকে, এই জন্মদিনটা অনেক আলাদা। কারণ, তুমি এখন তোমার শৈশবের গণ্ডি পেরিয়ে শিক্ষার এক বিশাল সমুদ্রে পা রেখেছ। এই যাত্রা কেবল বই পড়ার নয়, বরং ভালো মানুষ হিসেবে নিজেকে চেনার। আস্তে আস্তে তুমি স্কুলের নতুন জগতে আরও গভীরভাবে মিশে যাবে, নতুন বন্ধু হবে, নতুন পৃথিবী চিনবে। কিন্তু আমাদের কাছে তুমি চিরকাল সেই চার বছর আগের ছোট্ট রাজকন্যাই থাকবে।
ইতিমধ্যে তোমার মাঝে আমি কিছু জিনিসের লক্ষণ অনুভব করছি। সেগুলো একই সাথে মায়াবী এবং ভয়ের! ভয়টা হচ্ছে সময়ের সাথে সাথে আমার সাথে তোমার দূরত্বের। এই বয়সে তুমি নিজের একটা জগৎ তৈরি করেছ – তোমার গল্প আছে, কল্পনা আছে, পছন্দ-অপছন্দ আছে। তুমি এখন পৃথিবীকে শুধু দেখো না, অনুভব করো। আর তোমার এই অনুভব আমাকে প্রতিদিন নতুন করে ভাবতে শেখায় – আমি কেমন মানুষ হতে চাই, কেমন বাবা হতে চাই। এই চার বছরে আমি দেখেছি, তুমি ধীরে ধীরে নিজের ভাষা খুঁজে পাচ্ছো। কখনো গান গেয়ে, কখনো গল্প বানিয়ে, কখনো নিঃশব্দ অভিমান দিয়ে তুমি নিজের কথা বলো। আমি বুঝতে শিখছি যে, শিশুদের সব কথা শব্দে হয় না; অনেক কথা চোখে থাকে, আচরণে থাকে। একজন বাবা হিসেবে আমার দায়িত্ব শুধু শোনা নয়, বোঝার চেষ্টাও করা।
তোমার সেই সময়টা খুবই চমৎকার – এখন তুমি আর কেবল আদরের শিশুটি নেই; তুমি এখন একজন স্বতন্ত্র ব্যক্তিসত্তা। এখন তুমি নিজের সিদ্ধান্ত নিতে ভালোবাসো – কোন রঙের জামাটি পরবে কিংবা কোন গল্পটি আজ শোনাতে হবে। তোমার নিজস্ব যুক্তি, পছন্দ-অপছন্দ আর প্রখর বুদ্ধিমত্তা আমাদের প্রতিনিয়ত অবাক করে। ‘মুনতাহা’ (চূড়ান্ত উচ্চতা) অর্থটি যেন তোমার বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের সাথে মিলে যাচ্ছে। তোমার কথা বলার ভঙ্গি এখন অনেক বেশি পরিণত। মাঝে মাঝে তুমি এমন সব কথা বলে ফেলো যে আমরা বিস্ময়ে হতবাক হয়ে যাই। তুমি শিখছো কোনটা সঠিক আর কোনটা ভুল, শিখছো অন্যের সাথে আনন্দ ভাগ করে নিতে।

তুমি এখন অনুভব করতে শিখছো – ভালো লাগা, কষ্ট, রাগ, আনন্দ। কখনো খুব সহজে হাসো, আবার কখনো অল্পতেই অভিমানের কান্না শুরু করে দাও। তোমার এই স্বচ্ছ আবেগগুলো আমাকে শেখায়, শক্ত হওয়া মানে অনুভূতিহীন হওয়া নয়। বরং অনুভব করেই মানুষ শক্ত হয়। আম্মা, আমি চাই তুমি বড় হও এমন একজন মানুষ হয়ে, যে নিজের অনুভূতিকে সম্মান করতে জানে। যে প্রশ্ন করতে ভয় পায় না, আবার ভুল স্বীকার করতেও পিছপা হয় না। পৃথিবী তোমাকে অনেক কিছু হতে বলবে – আমি শুধু চাই, তুমি আগে মানুষ হও।
তোমার এই বড় হয়ে উঠার সময়টাতে আমি স্পষ্টভাবে টের পাই, আমার ভূমিকাও বদলাচ্ছে। আগে তোমাকে আগলে রাখাই ছিল প্রধান কাজ; এখন তোমাকে বুঝতে শেখা, বিশ্বাস করতে শেখাই বড় দায়িত্ব। তুমি যখন নিজের মতো করে কিছু করতে চাও, আমি এবং তোমার মা ভয় পাই ঠিকই, কিন্তু সেই ভয়েই লুকিয়ে থাকে গর্ব।
এই বছরটা তোমার জন্য শুধুই আরেকটা বছর নয়, আমাদের ঘরের ভেতরে একটা নতুন ঋতুর শুরু। এই বছরটাই আলাদা, কারণ এই বছর তুমি প্রথমবারের মতো স্কুলে যেতে শুরু করেছ। অবশ্য নির্ভেদের কল্যাণে স্কুলের সাথে তোমার পরিচিত আগে থেকেই ছিলো। কিন্তু ‘ভাইয়ার স্কুল’ থেকে ‘আমার স্কুল’ বলার এই যাত্রাটা তোমার জন্য কতটা উত্তেজনার ছিলো তার রাজসাক্ষী হয়ে রইলাম আমরা দুজন। এখন তোমার ছোট্ট মননে “স্কুল” শব্দটা বিশাল এক স্বপ্নের মতো, আর সেই স্বপ্নের রঙ অবশ্যই একটাই – পিংক।
পড়াশোনা শুরুর প্রস্তুতি হিসেবে তোমার সব বায়নাই ছিলো পিংকময়! পড়ার টেবিল পিংক হতে হবে, স্কুল ব্যাগ পিংক, টিফিন বক্স পিংক, পেন্সিল বক্স পিংক – এমনকি পায়ের জুতাটাও পিংক না হলে চলবে না। মনে হয়, তুমি তোমার ছোট্ট পৃথিবীটা নিজের মতো করে রঙ করতে শিখে গেছো। আমরা শুধু পাশে দাঁড়িয়ে সেই রঙিন দৃশ্যটা উপভোগ করি। এই গোলাপি রঙের আবদারে পুরো ঘর হয়ে উঠেছিলো একটা স্বপ্নপুরী!
আর সেদিন যখন প্রথমবার তোমাকে স্কুলের পোশাকে দেখলাম, মনে হলো সময় কত দ্রুত বয়ে যায়! পিঠে ছোট একটা ব্যাগ, চোখে কৌতূহল আর মনে কিছুটা দ্বিধা নিয়ে যখন তুমি ক্লাসরুমের দিকে এগিয়ে গেল, তখন আমাদের বুকটা এক অদ্ভুত গর্ব আর শূন্যতায় ভরে উঠেছিল। যে মেয়েটি সারাদিন আমাদের পায়ে পায়ে ঘুরে বেড়ায়, সে আজ নিজের এক নতুন জগৎ তৈরি করতে শিখছে। স্কুল থেকে ফিরে যখন তুমি উত্তেজনার সাথে তোমার নতুন বন্ধুদের গল্প শোনাও, কিংবা হাত নেড়ে নতুন শেখা কোনো ছড়া বা গান শোনাও – তখন মনে হয় আমাদের জীবনের শ্রেষ্ঠ প্রাপ্তিগুলো এই ছোট ছোট মুহূর্তেই লুকিয়ে আছে।
এই বছরে তোমার সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটা আমি দেখছি তোমার ব্যক্তিত্বে। বিশেষ করে বাবা হিসেবে আমার উপর তোমার “অধিকার প্রতিষ্ঠা”র মানসিকতা। এখন তুমি নির্দ্বিধায় আমার কাছে বায়না করো। আমার কোনো কথা বা কাজ যদি তোমার মন মতো না হয়, তুমি রাগ করো না – অভিমান করো। একদম নরম, সহজ অভিমান। চোখে জল আসে না, গলায় কষ্টের সুর আসে। আর সেই অভিমানটাই সবচেয়ে ভারী লাগে।
দুষ্টুমি করে বকা খাওয়ার পর মজার ব্যাপার হলো, সরি বলতে হয় আমাকেই গিয়ে। কারণ বাবারা নাকি এমনই হয়! যদিও এই বিষয়টা নিয়ে তুমি ইতিমধ্যে তোমার নিজের একটা পরিষ্কার মতামত দিয়ে ফেলেছো। একদিন দুষ্টুমির জন্য আমি তোমাকে বকা দিয়েছিলাম। বকা শেষ হতেই তুমি খুব শান্ত গলায় তুমি আমাকে বললে, “তুমি আমাকে বকা দিও না। পাপারা বকা দেয় না।” আমি একটু হেসে বললাম, “তাহলে তুমি যে দুষ্টুমি কর?” তোমার স্পষ্ট এবং জড়তাহীন জবাব ছিলো, “দুষ্টুমি করলে মা বকা দিবে, তুমি না।”
এই কথার মধ্যে যে দুষ্টুমি, বুদ্ধি আর ভালোবাসা মিশে আছে সেটা বলে বা লিখে বোঝানো যাবে না। চার বছর বয়সেই যে তুমি সম্পর্কের মানচিত্র তুমি এঁকে ফেলেছো – মা শাসনের জায়গা, আর বাবা নিরাপত্তা আর আশ্রয়ের। এই যে বাবার কাছে শুধু আদর পাওয়ার আর মাকে ‘শাসন’ করার লাইসেন্স দেওয়ার দর্শন – এটাই বোধহয় পৃথিবীর সবচেয়ে পবিত্র সম্পর্ক। চার বছরের এই ছোট্ট মানুষটি জীবনের যে আনন্দ আর আবেগ আমাদের প্রতিদিন উপহার দিচ্ছে, তার কোনো তুলনা হয় না।
এই বছরের আরেকটি স্মৃতি আছে, যেটা ভাবলেই বুকের ভেতরটা অদ্ভুতভাবে মোচর দিয়ে উঠে। একদিন তুমি তোমর মায়ের ফেসবুকে রিল দেখছিলে। ঘটনাক্রমে এমন একটি রিল সামনে আসে – একটি ছোট মেয়ে শাড়ি পরে, সেজেগুজে, দরজার আড়ালে লুকিয়ে দাঁড়িয়ে আছে তার বাবাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য। আর বাবা ঘরে ফিরে নিজের মেয়েকে দেখে অবাক হয়ে যায়। ভিডিওটা শেষ হওয়ার আগেই তুমি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলে যে, তুমিও ঠিক এমনটাই করবে।
রিল দেখা শেষ হতেই তুমি মায়ের কাছে বায়না ধরলে – শাড়ি পরে সেজেগুজে বাবাকে সারপ্রাইজ দেবে। প্রথমে বিষয়টা আমাদের কাছে একটু হাস্যকর আর একটু অবিশ্বাস্যই লেগেছিল। কিন্তু তোমার চোখের উচ্ছ্বাস, উত্তেজনা আর আবদারের দৃঢ়তা দেখে শেষ পর্যন্ত নিশকার মাকেও হার মানতে হয়। সেদিন সে একটি শাড়ি পরে, ঠোঁটে লিপস্টিক লাগিয়ে, মায়ের গহনা পরে নিজেকে এমনভাবে সাজিয়েছিল – যেন সে কোনো রাজকন্যা।
তারপর, নিজের প্রস্তুতি সম্পন্ন করে লাফ দিয়ে আমার সামনে এসে দাঁড়ালে। সেই মুহূর্তে তোমার চোখে যে আনন্দ, গর্ব আর উচ্ছ্বাস ছিল – তা কোনো ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব না। নিজেকে সুন্দর মনে করার আনন্দ, বাবাকে চমকে দেওয়ার সাফল্য, আর সেই নিষ্পাপ হাসি – সব মিলিয়ে এমন এক অনুভূতি, যা কোটি টাকা দিয়েও কেনা সম্ভব নয়। সেদিন তুমি আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছিলে, ভালোবাসা কতটা সরল হতে পারে। কখনো পিংক ব্যাগে, কখনো নরম অভিমানে, আবার কখনো শাড়ি পরে বাবাকে সারপ্রাইজ দেওয়ার ছোট্ট স্বপ্নে।
নতুন নতুন জিনিস শেখার আগ্রহ, বইয়ের পাতা উল্টানো, বর্ণমালার সাথে সখ্যতা আর চারপাশের পরিবেশকে নিজের মতো করে ব্যাখ্যা করা – সবই এখন তোমার দিনলিপির অংশ। তুমি যখন তোমার ছোট ছোট হাত দিয়ে আমাদের সাহায্য করতে আসো, কিংবা যখন অন্য কারো কষ্ট দেখে ব্যথিত হও, তখন মনে হয় আমাদের সার্থকতা এখানেই। আসলে এই চার বছরে তুমি শুধু বড় হওনি – তুমি আমার হৃদয়ের ভেতর জায়গা করে নিয়েছো আরও গভীরভাবে।
মা, তুমি বড় হচ্ছো। তোমার স্কুলে যাওয়া, তোমার পিংক পছন্দ, তোমার ছোট ছোট অভিমান – সব মিলিয়ে তুমি আমাকে প্রতিদিন নতুন করে বাবা হতে শেখাচ্ছো। হয়তো একদিন এই দুষ্টু-মিষ্টি স্মৃতিগুলো ঝাপসা হয়ে যাবে, কিন্তু আজ, তোমার জন্মদিনে, আমি শুধু এটুকুই চাই – তোমার এই কৌতূহলী চোখ আর সুন্দর হাসিটা যেন আজীবন এমনই অটুট থাকে। তুমি নামের সার্থকতা বজায় রেখে পৌঁছাও সাফল্যের শিখরে, কিন্তু তোমার হৃদয়টা যেন সর্বদা মাটির কাছাকাছি থাকে। আমাদের প্রার্থনা, তুমি যেন একজন আলোকিত মানুষ হও। তোমার মেধা আর মমতা দিয়ে তুমি যেন এই সুন্দর পৃথিবীকে আরও একটু সুন্দর করে তুলতে পারো।
শুভ জন্মদিন, আমার মা। তুমি যেমন আছো, ঠিক তেমনই থাকো – দুষ্টু, মিষ্টি, সাহসী আর ভালোবাসায় ভরা।


Discussion
No comments yet.